Thursday, April 9th, 2026, 9:19 pm

দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ: ‘কৌশলগত পরাজয়ে’ বিপর্যস্ত নেতানিয়াহু, রাজনৈতিক চাপে ইসরাইল

 

আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক ইরান-সংক্রান্ত সংঘাতে কোনো পক্ষই স্পষ্ট জয় না পেলেও সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরাজিত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চাপ সৃষ্টি এবং যুদ্ধের পক্ষে প্রচারণা চালানোর পর শেষ পর্যন্ত একটি ভঙ্গুর ও অস্পষ্ট যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে তার পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

শুরুর দিকেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইরানে শাসন পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অবাস্তব বলে উল্লেখ করেছিল, যা পরবর্তীতে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। ইসরাইলের ধারণা ছিল যুদ্ধ স্বল্পমেয়াদি হবে, কিন্তু বাস্তবে তা দীর্ঘায়িত হয় এবং প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল আসেনি। এমনকি যুদ্ধবিরতির আগ মুহূর্তেও ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চুক্তি থেকে সরে আসতে চাপ দেন নেতানিয়াহু। তবে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প নিজ সিদ্ধান্তে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হন এবং ইসরাইলকে কার্যত প্রক্রিয়ার বাইরে রেখেই সমঝোতা সম্পন্ন হয়।

ইসরাইলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ এই ঘটনাকে দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় রাজনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় ইসরাইল আলোচনায়ই ছিল না, যা নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের বড় ব্যর্থতা। একই ধরনের সমালোচনা করেছেন বামপন্থি নেতা ইয়ার গোলান, যিনি এই যুদ্ধবিরতিকে ‘চরম কৌশলগত ব্যর্থতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

নেতানিয়াহুর ঘোষিত লক্ষ্য—ইরানে শাসন পরিবর্তন, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দখল কিংবা রাষ্ট্র কাঠামো দুর্বল করা—এর কোনোটিই অর্জিত হয়নি। বরং এক মাসব্যাপী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ চাপ সহ্য করে ইরানের ‘ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডস কোর’ (আইআরজিসি) রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, এই ব্যর্থতার পর নেতানিয়াহু দক্ষিণ লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখে নিজের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন। তবে হিজবুল্লাহর মতো শক্তিশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে স্থলযুদ্ধ ইসরাইলের জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। পাশাপাশি গাজায় চলমান অভিযানের কারণে আন্তর্জাতিক মহলেও ইসরাইলের ভাবমূর্তি ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই পরিস্থিতি নেতানিয়াহুর জন্য বড় রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবে সেই সংকটের কোনো সমাধান আসেনি। এমনকি সম্ভাব্য নতুন চুক্তিতে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার আংশিক স্বীকৃতি পেতে পারে—যা পূর্বে বারাক ওবামা আমলের পারমাণবিক চুক্তির কাছাকাছি অবস্থান বলে মনে করা হচ্ছে।

ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ‘হারেৎজ’-এর সামরিক বিশ্লেষক আমোস হারেলের মতে, নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা ছিল অবাস্তব এবং বিশেষজ্ঞ মতামত উপেক্ষা করে নেওয়া সিদ্ধান্তের ফল। গাজা ও লেবাননের পর এখন ইরান ইস্যুতেও তার ‘চূড়ান্ত বিজয়’-এর প্রতিশ্রুতি বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরান ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত রাখলেও সাম্প্রতিক ব্যর্থতার পর ইসরাইলি জনগণের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কার্যকারিতা আর কতটা অবশিষ্ট রয়েছে।

এনএনবাংলা/