Monday, April 13th, 2026, 6:49 pm

মাটির খেলনা-তৈজসপত্র তৈরিতে ব্যস্ত কুলাউড়ার মৃৎশিল্পীরা

জেলা প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার:

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায় কুমার পাড়াতে মৃৎশিল্পীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। যেখানে মাটির ব্যাংক, হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল, হাতি, ঘোড়াসহ নানা বৈশাখী উপকরণ তৈরি করা হচ্ছে। নতুন বছরকে বরণ করে নিতে গ্রামীণ ও লোকজ সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে এসব মাটির তৈজসপত্র ও খেলনা মেলায় বিক্রির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। কুমারেরা বৈশাখী মেলাকে কেন্দ্র করে মাটির তৈরি ব্যাংক, হাঁড়ি-পাতিল, সরা, টব এবং নানা ধরণের পুতুল ও খেলনা তৈরি করছেন। মেলায় মাটির জিনিসের চাহিদা বাড়ায় কুলাউড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কুমারপাড়ায় নারী-পুরুষ মিলে এখন দিনরাত কাজ চলছে। মাটির তৈরি পুতুল ও হাতি-ঘোড়াগুলো গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রচেষ্টা। বৈশাখী মেলা কেন্দ্রীক এই কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে কুমারেরা বাড়তি আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কুমারপাড়ায় মাটির সংকট ও কারিগরের অভাবে এই পেশা অস্তিত্ব সংকটে থাকলেও বৈশাখ উপলক্ষে নতুন করে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন তারা। বাঙ্গালী জাতি যুগ যুগ ধরে পহেলা বৈশাখ অর্থাৎ বাংলা শুভ নববর্ষ উদযাপন করে আসছে। কুলাউড়ায় পহেলা বৈশাখকে ঘিরে কর্মব্যস্ত সময় কাটছে কুমারপাড়ার মানুষের।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কর্মধা ইউনিয়নের মনসুরপুর গ্রামের কুমার বাড়িতে কুমাররা মাটি দিয়ে তৈরী করছে হাঁড়ি, দই, পিঠার খোলা, মাছ ধোয়ার পাতিলসহ বিভিন্ন ধরনের টেপা পুতুল। কারিগররা মাটি প্রস্তুত করে বিভিন্ন ধরনের জিনিস তৈরী করে রোদে শুকিয়ে আগুনে পুড়িয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এসময় কুমার হরেন্দ্র রুদ্র পাল (৭০), অরুণ রুদ্র পাল (৫১), অপেন্দ্র রুদ্র পাল (৫৬), নীলা রাণী রুদ্র পাল (৬০), লিপি রানী পাল (৩২) জানান, আমাদের লোকজন মাটির লৌহার দিয়ে নানা ধরনের জিনিস তৈরী করে। প্রতিটা জিনিস মানুষের কাজে আসে। তারা বছরের শুরুতেই বৈশাখী মেলায় বিক্রির জন্য কুমাররা মাটি দিয়ে নানা ধরনের জিনিস তৈরী করেন। পহেলা বৈশাখে মেলায় জিনিস বিক্রি করে আয়-রোজগার করবে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্লাস্টিক, মেলামাইন ও স্টিলের দাপটে প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো এই ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। এ সম্প্রদায়ের প্রায় ৩০টি পরিবার এই পেশার সাথে জড়িত। তাদের এ ব্যবসা আর ধরে রাখতে পারছে না। মাটি দিয়ে তৈরী করার কারিগররা বেকার হয়েছে পড়ছেন। নতুন প্রজন্ম অন্যান্য কাজে ঝুঁকে পড়ছে। আমাদের এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে মাটি ও লাকড়ি। এসবের অভাবে আমরা আগের মতো মৃৎশিল্প তৈরি করতে পারছি না। এমনকি সরকার থেকে কোন সাহায্য-সহযোগিতা কোনদিন পাইনি, শুধু নাম যায় আর কোন খবরও পাই না।

এ বিষয়ে কুলাউড়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা প্রাণেশ চন্দ্র বর্মা বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে অনগ্রসর জনগোষ্ঠিকে সর্বদা সাহায্যসহযোগিতা করা হচ্ছে। বিশেষ করে কুমার, কামার, তাঁতী এসব অনগ্রসর জনগোষ্ঠির ভাতা চালু রয়েছে। এর মধ্যে অনেকেই এই ভাতার আওতাভুক্ত রয়েছেন। যারা অনলাইনে আবেদন এখনও করেননি তাদেরকে আমরা তালিকায় আনার চেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছি।

এ বিষয়ে লংলা আধুনিক ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাজহারুল ইসলাম বলেন, বাঙালি মৃত্তিকা ঘনিষ্ট জাতি। মাটি থেকে দূরে গেলে এ জাতি মরে যায়। হাজার বছরের মৃত্তিকা শিল্পী আজ নিঃস্ব। আমরাও  কৃত্রিমতা আঁকড়ে আছি। মাটির তৈজসপত্র ও বাহারি জিনিসপত্রকে আবারও দৈনন্দিন জীবনে ধারণ করা একান্ত জরুরি। মৃত্তিকা শিল্পীদের বাঁচাতে ও নিজেদের জাতিসত্তা ধরে রাখতে। আর্থিক সহায়তায় সরকারী ও বেসরকারি উদ্যোগে তাদের পাশে থাকতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে এধরণের মাটির কাজে যারা জরুরী তাদের সাথে জনসাধারণকে আরো ঘনিষ্ট হতে হবে।

এ বিষয়ে লংলা ডিগ্রি কলেজের কৃষি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোঃ হেলাল খান বলেন, প্রাচীনকালে এদেশে বসবাসকারী জনগোষ্ঠির মধ্যে যারা ছিল তারা হলো কুমার, কামার, তাঁতী ও জেলে। এদের পেশা বংশ পরম্পরায় চলে আসছে। কিন্তু আধুনিক কলকারখানা ও তথ্য প্রযুক্তির যুগে এসব হাতের তৈরি উত্তরাধিকারী পেশা আজ বিলুপ্ত প্রায়। যে দুই একটা পেশা টিকে আছে তা উৎসবকেন্দ্রিক এবং আধুনিক সৌন্দর্য্যরে প্রভাবে কিন্তু বাস্তবে এই পেশার জীবনমান খুবই করুণ। পহেলা বৈশাখে আমরা বাঙালিরা নতুন করে বাঙালি সাজতে গিয়ে পান্তা ভাত মাটির সানকি বিভিন্ন মাটির তৈজসপত্র ব্যবহার করে আনন্দ উদযাপন করি। এজন্য প্রয়োজন মাটি ও জ্বালানি কাঠ। বর্তমানে এই দুই উপাদানের খুবই অভাব থাকায় চাহিদা অনুযায়ী তারা এসমস্ত পণ্য তৈরি করতে পারছেন না। এজন্য এই সম্প্রদায়কে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। দারিদ্রের সাথে প্রচন্ড লড়াই করে বাঁচতে হচ্ছে। আমার মনে হয় স্থানীয় প্রশাসন ও সরকার এই সমস্ত সম্প্রদায়ের প্রতি সুদৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।