সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা দেখে কেউ কেউ ভোটের ফলাফল ঘোষণা শুরু হওয়ার পরও হয়তো ভেবেছিলেন, জামায়াতই রাষ্ট্রক্ষমতায় আসতে চলেছে। দলটির বিভিন্ন ফেসবুক পেজ এবং ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ইনফ্লুয়েন্সাররা সমর্থকদের এমন এক ‘বাবল’-এর মধ্যেই রেখেছিলেন, যেখানে বারবার বলা হচ্ছিল—‘এখনও হাড্ডাহাড্ডি’। আবার কেউ কেউ বাস্তবতায় ফেরার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার স্বপ্ন আকাশকুসুম কল্পনা।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর সমালোচকেরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, দলটি কখনোই দেশের প্রধান গণভিত্তিক শক্তি নয়। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও সত্য, দলটি কখনো নিছক প্রান্তিক কোনো শক্তিও ছিল না। বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতিতে বারবারই রাষ্ট্রক্ষমতার সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দলটি।
অতীতের ফলাফল বনাম এবারের রেকর্ড
- ১৯৯১ সালে জামায়াতে ইসলামী পেয়েছিল ১৮টি আসন (ভোট ১২.১৩%)।
- ১৯৯৬ সালে আসন কমে দাঁড়ায় ৩টিতে (ভোট ৮.৬১%)।
- ২০০১ সালে তারা পায় ১৭টি আসন (ভোট ৪.২৮%)।
- ২০০৮ সালে মাত্র ২টি আসন (ভোট ৪.৬%)।
এবারের নির্বাচনে দলটির একক আসন ৬৮, আর তাদের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন—যা তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ১৮ থেকে ৭৭—এই উত্থান শুধু সংখ্যাগত নয়; এটি বাংলাদেশের ভোট মানচিত্রে একটি বড় রূপান্তরের ইঙ্গিত।
‘হাড্ডাহাড্ডি’ বাস্তবতা ও ভোটের মনস্তত্ত্ব
আসনের হিসাবে বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও ভোটের ব্যবধানে অনেক জায়গায় হয়েছে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। উদাহরণ হিসেবে ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জয় এসেছে মাত্র ৪,৩৯৯ ভোটের ব্যবধানে—যা জনবহুল দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছোট মার্জিন হিসেবেই বিবেচিত।
এতে স্পষ্ট, মাঠের বাস্তবতায় জামায়াত বেশ কিছু আসনে শক্ত পরীক্ষা নিয়েছে। প্রশ্ন হলো—এই উত্থান কি শুধু আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতির ফল?
শূন্যস্থান ও ফ্লোটিং ভোটারদের ভূমিকা
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি নিঃসন্দেহে বড় কারণ, তবে একমাত্র কারণ নয়। দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় মেরুকরণ ভেঙে যাওয়ায় তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক শূন্যতা। এ শূন্যতার লড়াইয়ে ফ্লোটিং ও নীরব ভোটারদের একটি অংশকে তুলনামূলক বেশি টানতে পেরেছে জামায়াতে ইসলামী।
বাংলাদেশের ভোটার ধর্মপ্রাণ হলেও রাজনৈতিকভাবে বাস্তববাদী। বাজারদর, চাকরি, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় নেতৃত্বের উপস্থিতি—এসবই ভোটের বড় ফ্যাক্টর। ফলে ‘বাংলাদেশে ইসলাম মানেই জামায়াত’—এই ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। ইসলাম একটি সামাজিক বাস্তবতা; জামায়াত একটি রাজনৈতিক প্রকল্প।
জোট-রাজনীতি: এনসিপির বৈধতার প্রভাব
এবারের নির্বাচনে জামায়াতের উত্থানকে একক দল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণায় জামায়াত পেয়েছে ৬৮ আসন, আর তাদের নেতৃত্বাধীন জোট ৭৭। জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পেয়েছে ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি এবং খেলাফত মজলিস ১টি আসন।
জুলাই আন্দোলনের আবেগ থেকে উঠে আসা এনসিপি জামায়াতকে রাজনৈতিক বৈধতা দিতে ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষকদের মত। নতুন বিকল্পের খোঁজে থাকা ভোটারদের একটি অংশ এই জোটের দিকে ঝুঁকেছে।
‘মজলুম’ ন্যারেটিভ ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক ভাষা
২০১৩–১৪ সালের যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রেক্ষাপটে একদিকে দলটি সমালোচনার মুখে পড়ে, অন্যদিকে মামলা-হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ‘মজলুম’ ন্যারেটিভ তৈরি করে। এই আবেগ ধর্মপ্রাণ ভোটারদের একটি অংশের সহানুভূতি আদায় করেছে।
জুলাই-পরবর্তী সময়ে দলটি ইনসাফ, সততা, সামাজিক ন্যায়বিচার—এসব শব্দ সামনে এনে নিজেদেরকে নৈতিক বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেছে। অনেক ভোটার আদর্শগত সমর্থনের চেয়ে ‘কম দুর্নীতিগ্রস্ত’ বিকল্প হিসেবেও দলটিকে বিবেচনা করেছেন।
ভারতবিরোধী রেটোরিক ও রাজনৈতিক আবেগ
সমসাময়িক সময়ে ভারতবিরোধী আবেগও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জামায়াত নিজেদেরকে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছে, যা একটি অংশের ভোট টানতে সহায়তা করেছে।
সাংগঠনিক শক্তি: উত্থানের মেরুদণ্ড
২০০৮ সালে কার্যত ধসে পড়ার পরও জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামো অটুট ছিল। এবারের নির্বাচনে ৬৮ জন নির্বাচিতের মধ্যে ৬৫ জনই প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছেন। বাড়ি বাড়ি প্রচারণা, শৃঙ্খলাবদ্ধ সংগঠন, বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকা—এসবই ভোট বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
ঢাকায় নতুন বাস্তবতা
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতায় থাকা ১৫টি আসনের মধ্যে জামায়াত পেয়েছে ৬টি, আর তাদের জোটসঙ্গী এনসিপি পেয়েছে ১টি। রাজধানীতে ৭ আসন পাওয়া সাম্প্রতিক রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিচ্ছে।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি, জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক শূন্যতা, জোট-রাজনীতি, তরুণ ভোটারদের পুনর্বিন্যাস, ধর্মভিত্তিক নৈতিক ন্যারেটিভ, ভারতবিরোধী আবেগ এবং শক্ত সাংগঠনিক কাঠামো—সব মিলিয়ে জামায়াতে ইসলামীর এবারের উত্থান একটি বহুমাত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল।
১৮ থেকে ৭৭—এই সংখ্যাটি কেবল আসন বৃদ্ধির গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের ভোট-মনস্তত্ত্ব, জোট কৌশল এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি।
(প্রতিবেদনটি বিডি নিউজ২৪ থেকে তথ্য নিয়ে করা)
এনএনবাংলা/

আরও পড়ুন
ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি হবে বিরোধী দল থেকে
ফলাফল মেনে দায়িত্বশীল বিরোধীদল হিসেবে কাজ করার ঘোষণা জামায়াত আমিরের
নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি