Tuesday, March 10th, 2026, 2:36 pm

ঢাবিতে তোফাজ্জল হত্যা: ২৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট, ২২ জনের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফজলুল হক মুসলিম হলে চোর সন্দেহে মানসিক ভারসাম্যহীন যুবক তোফাজ্জলকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ২৮ জনের বিরুদ্ধে পুলিশের দেওয়া সম্পূরক চার্জশিট গ্রহণ করেছেন আদালত। একই সঙ্গে পলাতক থাকা ২২ জন আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (১০ মার্চ) দুপুরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালত এ আদেশ দেন।

প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই জিন্নাত আলী বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আদালত পুলিশের দাখিল করা সম্পূরক চার্জশিট আমলে নিয়েছেন। পাশাপাশি মামলাটি বিচারের জন্য বদলির নির্দেশ দিয়েছেন। যদিও এ চার্জশিটের বিরুদ্ধে বাদীপক্ষের নারাজি দেওয়ার কথা ছিল, তবে তারা তা দেননি।

এর আগে ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. হান্নানুল ইসলাম ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে সম্পূরক চার্জশিট জমা দেন। পরে আদালত ১০ মার্চ চার্জশিটের গ্রহণযোগ্যতা বিষয়ে শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন।

চার্জশিটে অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন— পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. জালাল মিয়া (২৬), মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের সুমন মিয়া (২১), পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের মো. মোত্তাকিন সাকিন শাহ (২৪), ভূগোল বিভাগের আল হোসেন সাজ্জাদ (২৩), ফজলুল হক মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. আহসান উল্লাহ ওরফে বিপুল শেখ (২৪), ওয়াজিবুল আলম (২২), মো. ফিরোজ কবির (২৩), মো. আব্দুস সামাদ (২৪), মো. সাকিব রায়হান (২২), মো. ইয়াছিন আলী গাইন (২১), মো. ইয়ামুজ্জামান ওরফে ইয়াম (২২), মো. ফজলে রাব্বি (২৪), শাহরিয়ার কবির শোভন (২৪), মো. মেহেদী হাসান ইমরান (২৫), মো. রাতুল হাসান (২০), মো. সুলতান মিয়া (২৪), মো. নাসির উদ্দীন (২৩), মো. মোবাশ্বের বিল্লাহ (২৫), শিশির আহমেদ (২২), মো. মহসিন উদ্দিন ওরফে শাফি (২৩), আব্দুল্লাহিল কাফি (২১), শেখ রমজান আলী রকি (২৫), মো. রাশেদ কামাল অনিক (২৩), মো. মনিরুজ্জামান সোহাগ (২৪), মো. আবু রায়হান (২৩), রেদোয়ানুর রহমান পারভেজ (২৪), রাব্বিকুল রিয়াদ (২৩) ও মো. আশরাফ আলী মুন্সী (২৬)।

অভিযুক্তদের মধ্যে আহসান উল্লাহ ওরফে বিপুল শেখ এবং ওয়াজিবুল আলম বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। এছাড়া গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন চারজন— জালাল মিয়া, আল হোসেন সাজ্জাদ, মো. মোত্তাকিন সাকিন শাহ ও সুমন মিয়া।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হান্নানুল ইসলাম জানান, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আগে অব্যাহতি পাওয়া আটজনের বিরুদ্ধেও পুনরায় তদন্ত করা হয়েছে। আগের তদন্তে অভিযুক্ত ২১ জনসহ মোট ২৮ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হয়েছে। এ ঘটনায় এদের বাইরে আর কাউকে আসামি হিসেবে শনাক্ত করা যায়নি।

এর আগে গত বছরের ১ জানুয়ারি শাহবাগ থানার পুলিশ পরিদর্শক আসাদুজ্জামান ২১ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট জমা দেন। তবে অন্য আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নাম থাকা আটজনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ায় বাদীপক্ষ নারাজি দেন। পরে আদালত ২৬ ফেব্রুয়ারি সেই নারাজি আবেদনের শুনানি শেষে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন।

সম্পূরক চার্জশিটে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ঘটনার দিন রাত ৭টা ৪০ মিনিট ১০ সেকেন্ডে তোফাজ্জল হলের মূল ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। তিন মিনিট ১৮ সেকেন্ড পরে তিনি হলের মাঠে যান। খেলা পরিচালনা মঞ্চের পাশ দিয়ে মাঠে বসার ৫৭ সেকেন্ডের মধ্যেই তাকে চোর সন্দেহে মারধর শুরু করে কিছু ছাত্র। পরে উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা তাকে মূল ভবনের দিকে নিয়ে যায়।

প্রায় ২৫ মিনিট জেরা ও মারধরের পর একদল ছাত্র বুঝতে পারে যে মোবাইল চুরির ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। এরপর তাকে হলের ক্যান্টিনে নিয়ে খাবার খাওয়ানো হয়। খাবার শেষে আবার তাকে মারধর করা হয়। পরে শিক্ষকরা এসে ছাত্রদের কাছ থেকে তাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করলেও প্রথমে ব্যর্থ হন। অবশেষে রাত ১০টা ৫২ মিনিটে তোফাজ্জলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ৮টার দিকে ফজলুল হক মুসলিম হলের গেটে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করছিলেন এক যুবক। এ সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে আটক করে প্রথমে হলের মূল ভবনের গেস্ট রুমে নিয়ে যান। মোবাইল চুরির অভিযোগ এনে সেখানে তাকে মারধর করা হয়। পরে তাকে মানসিক রোগী মনে করে ক্যান্টিনে নিয়ে খাবার খাওয়ানো হয়।

ক্যান্টিনে খাবার খাওয়ানোর পর তাকে হলের দক্ষিণ ভবনের গেস্ট রুমে নিয়ে জানালার সঙ্গে হাত বেঁধে স্টাম্প, হকিস্টিক ও লাঠি দিয়ে আবার বেধড়ক মারধর করা হয়। এতে তার মৃত্যু ঘটে।

এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর শাহবাগ থানায় মামলা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ। পরে ২৫ সেপ্টেম্বর নিহতের ফুফাতো বোন মোসাম্মৎ আসমা আক্তার ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক শাহ মুহাম্মদ মাসুমসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে তৎকালীন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আক্তারুজ্জামানের আদালতে মামলার আবেদন করেন। সেদিন আদালত বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের করা মামলাটির সঙ্গে একযোগে তদন্তের নির্দেশ দেন।

এনএনবাংলা/পিএইচ