Wednesday, April 8th, 2026, 1:16 pm

যুদ্ধবিরতির পথ দেখাল হরমুজ প্রণালি, নেপথ্যে পাকিস্তান

 

ইরানের বিরুদ্ধে টানা ৩৮ দিনের যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যৌথ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে নাটকীয় মোড় এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ‘সভ্যতা ধ্বংস’ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে একটি সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। তবে সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র দুই ঘণ্টা আগে তেহরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেষ মুহূর্তে হওয়া এই সমঝোতার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই চুক্তিতে পৌঁছানোর পেছনে নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।

যেভাবে সমঝোতায় পৌঁছানো গেল

মঙ্গলবার সকাল থেকেই পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। নির্ধারিত সময়—যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় রাত ৮টার—মধ্যে ইরান শর্ত না মানলে দেশটির সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের হামলার হুমকি দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছিলেন, এমন হামলা চালানো হবে যাতে ‘পুরো একটি সভ্যতা এক রাতেই ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তা আর কখনো ফিরে আসবে না।’

সিএনবিসি জানায়, বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার এই হুমকি ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় শিবিরেই গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। তবে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই ওভাল অফিস থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। তিনি এটিকে ‘দ্বিমুখী যুদ্ধবিরতি’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

নিউইয়র্ক টাইমস যুক্তরাষ্ট্রের এক সরকারি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, শর্ত মেনে নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই ইরানের ওপর সামরিক হামলা বন্ধ করেছে।

পথ দেখাল হরমুজ প্রণালি

এই যুদ্ধবিরতির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে হরমুজ প্রণালি। কয়েক সপ্তাহ ধরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহনপথটি অবরুদ্ধ করে রেখেছিল ইরান। ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানান, যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে তার প্রধান অগ্রাধিকার ছিল হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা।

ট্রাম্প জানান, ইরান অবিলম্বে সম্পূর্ণ নিরাপত্তার সঙ্গে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে সম্মত হয়েছে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র আগামী দুই সপ্তাহের জন্য তাদের সামরিক হামলা স্থগিত রাখবে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তেহরানও পাল্টা আক্রমণ বন্ধ রাখবে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করবে। ট্রাম্প আরও জানান, ইরান আলোচনার জন্য ১০ দফার একটি প্রস্তাব দিয়েছে, যাকে তিনি একটি ‘উপযুক্ত ভিত্তি’ হিসেবে বিবেচনা করছেন। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেই একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

মধ্যস্থতায় পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ছিলেন ভ্যান্স

মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে দিনরাত ধরে টানা আলোচনা হয়েছে। এতে মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব পালন করেছে পাকিস্তান। আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স।

ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী শুক্রবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা শুরু হতে পারে। তবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, সরাসরি আলোচনার বিষয়টি এখনও আলোচনাধীন এবং প্রেসিডেন্ট বা হোয়াইট হাউস থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত কিছুই চূড়ান্ত নয়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য যথাসময়ে প্রকাশ করা হবে।

তেলের বাজারে বড় দরপতন

হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম ১৭ শতাংশেরও বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি ৯২ ডলারে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে দেশটির শেয়ারবাজারে সূচকের ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে।

যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর তেহরানের রাস্তায় সাধারণ মানুষকে উল্লাস করতে দেখা গেছে। অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এই সিদ্ধান্তকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘লজ্জাজনক পিছু হটা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং দাবি করেছে, যুদ্ধ বন্ধ করতে ইরানের শর্তই শেষ পর্যন্ত মেনে নিতে হয়েছে।

এনএনবাংলা/পিএইচ