দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত দেড়শ বছরের পুরোনো বগুড়া পৌরসভাকে অবশেষে দেশের ১৩তম সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হয়েছে। সোমবার (২০ এপ্রিল) বেলা সোয়া ১২টার দিকে পৌর ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বগুড়া সিটি করপোরেশনের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। ঘোষণার পর তিনি ফলক উন্মোচন করেন এবং পৌরসভা চত্বরে একটি বৃক্ষরোপণ করেন।
উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বগুড়াকে সিটি করপোরেশন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, তবে শহরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এখন নাগরিকদের দায়িত্ব। তিনি জানান, শহরে প্রবেশের পথে বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা চোখে পড়েছে। তাই নাগরিকদের সচেতন হয়ে নিজেদের শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং এ কাজে প্রশাসন সব ধরনের সহযোগিতা করবে।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপি, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, বগুড়া-৬ সদর আসনের এমপি রেজাউল করিম বাদশা, বগুড়া-৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম) আসনের এমপি আলহাজ্ব মোশারফ হোসেন, বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) আসনের এমপি গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, বগুড়া-৩ (আদমদীঘি-দুপচাঁচিয়া) আসনের এমপি আব্দুল মহিত তালুকদার, বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনের এমপি মোরশেদ মিলটন, জেলা পরিষদ প্রশাসক আহসানুল তৈয়ব জাকির, জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান এবং পৌর প্রশাসক রাজিয়া সুলতানাসহ অন্যান্য অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর সোমবার প্রথমবারের মতো সরকারি সফরে বগুড়ায় আসেন তারেক রহমান। সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে তিনি বগুড়া শহরের সার্কিট হাউসে পৌঁছান। পরে সকাল ১১টায় বগুড়া জজ আদালতে ই-বেইল বন্ড সেবার উদ্বোধন করেন। দিনের দ্বিতীয়ার্ধে গাবতলী উপজেলায় খাল খনন কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ এবং হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধনের কথা রয়েছে। এছাড়া তিনি নিজ পৈতৃক বাড়ি পরিদর্শন শেষে বিকেলে শহরে ফিরে জেলা বিএনপির আয়োজিত বিকেল ৪টার সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে বগুড়া শহর ও আশপাশের এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সকাল থেকেই শহরের বিভিন্ন প্রবেশপথে নেতাকর্মীরা ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে ভিড় করেন তাকে একনজর দেখার জন্য। সিটি করপোরেশন ঘোষণার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শহরজুড়ে আনন্দের আমেজ তৈরি হয়। বিভিন্ন এলাকায় মিষ্টি বিতরণ, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায় অনেককে। দীর্ঘদিন ধরে বগুড়াকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার দাবি জানিয়ে আসা নাগরিক সমাজ, ব্যবসায়ী সংগঠন ও বিভিন্ন পেশাজীবী মহল এ ঘোষণাকে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বগুড়া উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে সুপরিচিত এবং ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত হওয়ায় এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। কৃষিপণ্য সরবরাহ, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আশপাশের একাধিক জেলা দীর্ঘদিন ধরে বগুড়ার ওপর নির্ভরশীল। তবে এ তুলনায় নগরসেবার পরিধি সীমিত ছিল বলে নাগরিকদের অভিযোগ ছিল।
ইতিহাসবিদদের তথ্যমতে, ১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বগুড়া পৌরসভা দেশের অন্যতম প্রাচীন পৌর প্রতিষ্ঠান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর আয়তন বৃদ্ধি পায় এবং ২০০৬ সালে আশপাশের ৪৮টি মৌজা যুক্ত করে পৌর এলাকার আয়তন প্রায় ৬৯ দশমিক ৫৬ বর্গকিলোমিটারে উন্নীত করা হয়। এরপর থেকেই এটিকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তরের দাবি আরও জোরালো হতে থাকে।
সিটি করপোরেশন মর্যাদা লাভের ফলে এখন বড় পরিসরে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, সড়ক সম্প্রসারণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, স্ট্রিট লাইটিং বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল নাগরিক সেবা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধির সম্ভাবনাও বাড়বে। নাগরিকদের মতে, যানজট, জলাবদ্ধতা, ফুটপাত দখল, অপরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থা, বাস টার্মিনাল সংকট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধানে কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি।
বগুড়া পৌরসভার ১১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সিপার আল বখতিয়ার বলেন, বগুড়া সিটি করপোরেশন হওয়ায় নতুন বিনিয়োগ, আবাসন, শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের বড় সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। তার মতে, বগুড়াবাসীর জন্য আজকের দিনটি শুধু প্রশাসনিক ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি নতুন আধুনিক নগর গড়ে তোলার সূচনালগ্ন।
এনএনবাংলা/পিএইচ


আরও পড়ুন
যারা সংস্কার সংস্কার করে তারা কিন্তু নারীর স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলে না
জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে: রিজভী
নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে সিরিজে সমতা ফেরাল বাংলাদেশ