Wednesday, April 22nd, 2026, 3:03 pm

ট্রাম্পের যুদ্ধব্যয়ের টাকায় ৮ কোটি মানুষের জীবন বাঁচানো যেত: জাতিসংঘ

ইরানে সম্ভাব্য সংঘাত ঘিরে প্রতিদিন যে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা দিয়ে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব—এমন উদ্বেগজনক মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক সংস্থা ওচা (ওসিএইচএ)-এর প্রধান টম ফ্লেচার। গত সোমবার লন্ডনের চ্যাথাম হাউসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, যুদ্ধের বাড়তি ব্যয় এবং আক্রমণাত্মক ভাষা বিশ্বব্যাপী এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের ঝুঁকি তৈরি করছে।

সাবেক ব্রিটিশ কূটনীতিক টম ফ্লেচার জানান, ইরান সংশ্লিষ্ট এই সংঘাতের পেছনে প্রতিদিন প্রায় ২০০ কোটি ডলার ব্যয় হচ্ছে। অথচ জাতিসংঘের জরুরি মানবিক সহায়তা পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রায় ৮ কোটি ৭০ লাখ মানুষের জীবন রক্ষায় পুরো বছরের জন্য প্রয়োজন মাত্র ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। তার ভাষায়, ‘এই বেপরোয়া যুদ্ধের মাত্র দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের ব্যয় দিয়েই আমরা একটি পূর্ণ বছরের মানবিক সহায়তার তহবিল সংগ্রহ করতে পারতাম। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’

বর্তমানে জাতিসংঘের মানবিক তহবিলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ হাজার কোটি ডলারের ঘাটতি রয়েছে। ফ্লেচার এই পরিস্থিতিকে ‘প্রলয়ংকরী’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ বৈদেশিক সাহায্যের বাজেট কমিয়ে সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর ফলে এই সংকট আরও গভীর হচ্ছে।

এ সময় সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানকে ‘বোমা মেরে প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেওয়ার’ মতো হুমকিমূলক বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন তিনি। ফ্লেচার বলেন, এ ধরনের সহিংস ভাষা স্বাভাবিক হয়ে গেলে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এতে বিশ্বের অন্যান্য স্বৈরশাসকরাও একই ধরনের কৌশল গ্রহণে উৎসাহিত হতে পারে, যা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামো ও সাধারণ মানুষকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।

ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে জাতিসংঘের সম্পর্কের অভিজ্ঞতাকে তিনি ‘রোলারকোস্টার রাইড’-এর সঙ্গে তুলনা করেন। তার মতে, ট্রাম্পের দল ঐতিহ্যগত রাষ্ট্র পরিচালনার কৌশলের পরিবর্তে ‘রিয়েল এস্টেট ক্রাফট’-ধাঁচের কৌশলে বেশি আস্থা রাখে। তারা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার বদলে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয় এবং অনেক সময় অনিশ্চয়তা বা বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনের চেষ্টা করে।

ফ্লেচার আরও সতর্ক করেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যস্ফীতি প্রায় ২০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশেষ করে আফ্রিকার দেশগুলোতে কয়েক বছর ধরে অনুভূত হবে, যা আরও লাখ লাখ মানুষকে চরম দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

একই সঙ্গে তিনি ব্রিটিশ রাজনীতিকদেরও সমালোচনা করেন। গত এক দশকে বৈদেশিক সাহায্যের বাজেট কমানোর ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাজ্যের নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা কমে গেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার মতে, যুক্তরাজ্যের এই সিদ্ধান্ত অন্য দেশগুলোকেও সাহায্যের পরিমাণ কমাতে উৎসাহিত করছে।

সবশেষে মানবিক সহায়তা কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন টম ফ্লেচার। তিনি জানান, গত তিন বছরে ড্রোন হামলাসহ বিভিন্ন ঘটনায় এক হাজারের বেশি ত্রাণকর্মী নিহত হয়েছেন। বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কেবল আনুষ্ঠানিক বিবৃতি নয়—ত্রাণকর্মীদের হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং তাদের কাছে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

এনএনবাংলা/পিএইচ