Wednesday, January 14th, 2026, 1:41 pm

ইরানে বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দিলে ‘খুবই কঠোর’ পদক্ষেপ নেওয়া হবে: ট্রাম্প

 

ইরানে বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি কার্যকর করা হলে যুক্তরাষ্ট্র ‘খুবই কঠোর পদক্ষেপ’ নেবে—এমন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত মঙ্গলবার এই সতর্কবার্তা দেন তিনি। তবে তেহরান পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের এসব বক্তব্য মূলত সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য অজুহাত তৈরির কৌশল।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, সাম্প্রতিক দমন–পীড়নে হাজারো মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চলমান এই বিক্ষোভগুলো ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের জন্য সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

জাতিসংঘে ইরানের মিশন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ‘খেলার বই’ আবারও ব্যর্থ হবে। বিবৃতিতে বলা হয়, ইরান বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি মূলত ‘সরকার পরিবর্তনের’ লক্ষ্যেই পরিচালিত। এর অংশ হিসেবে নিষেধাজ্ঞা, হুমকি, পরিকল্পিত অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে শেষ পর্যন্ত সামরিক হস্তক্ষেপের পথ তৈরি করা হয়।

ইরানি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, টানা কয়েক রাত দেশজুড়ে চলা বিক্ষোভের পর তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য ভিন্ন। তাদের অভিযোগ, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বিক্ষোভকারীরা নিহত হচ্ছেন এবং পাঁচ দিনের বেশি সময় ধরে চলা ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মাধ্যমে দমন–পীড়নের প্রকৃত চিত্র আড়াল করা হচ্ছে।

এর আগে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘সাহায্য আসছে।’ সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি কার্যকর করা শুরু করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘যখন হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে, আর এখন ফাঁসির খবর শোনা যাচ্ছে—তখন আমরা দেখব, এর পরিণতি তাদের জন্য কী হয়।’

ইরানের কৌঁসুলিরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে আটক কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে ‘মোহারেবেহ’ বা ‘ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার’ অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের মামলা করা হবে।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নতুন ভিডিওতে—যেগুলোর অবস্থান এএফপি যাচাই করেছে—তেহরানের দক্ষিণে কাহরিজাক মর্গে কালো ব্যাগে মোড়ানো মরদেহ সারিবদ্ধভাবে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে সেখানে ভিড় করছেন উদ্বিগ্ন পরিবারগুলো।

গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক ফোন কল আংশিকভাবে চালু হলেও কেবল আউটগোয়িং কল করা যাচ্ছে এবং সংযোগ বারবার বিচ্ছিন্ন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এএফপির এক সাংবাদিক।

এর আগে ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ইরানিদের ‘বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার’ আহ্বান জানান। তিনি লেখেন, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ‘অর্থহীন হত্যাকাণ্ড’ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব ধরনের বৈঠক বাতিল করেছেন। তবে কোন বৈঠক বা কী ধরনের সহায়তার কথা তিনি বলেছেন, তা স্পষ্ট করেননি।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

ইরানে দমন–পীড়নের ঘটনায় ইউরোপের দেশগুলোও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ ইরানি রাষ্ট্রদূতদের তলব করেছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ফন ডার লেয়েন বলেন, ইরানে ক্রমবর্ধমান প্রাণহানি ভয়াবহ। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেন তিনি।

নরওয়েভিভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর) জানিয়েছে, বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ৭৩৪ জন নিহত হওয়ার তথ্য তারা নিশ্চিত করেছে, যাদের মধ্যে নয়জন শিশু। তবে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। আইএইচআরের পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম বলেন, তাদের তথ্য দেশের অর্ধেকেরও কম প্রদেশ ও মাত্র ১০ শতাংশের কম হাসপাতাল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে; বাস্তবে নিহতের সংখ্যা সম্ভবত হাজার ছাড়িয়েছে।

আইএইচআর আরও জানায়, কারাজ শহরে গ্রেপ্তার হওয়া ২৬ বছর বয়সী এরফান সোলতানিকে ইতোমধ্যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং বুধবারই তার ফাঁসি কার্যকর হতে পারে।

অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সহিংসতায় নিরাপত্তা বাহিনীর ডজনখানেক সদস্য নিহত হয়েছেন। তাদের জানাজা সরকারপন্থী বড় সমাবেশে রূপ নিয়েছে। বুধবার তেহরানে ‘শহীদদের’ জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে গণ–জানাজার ঘোষণা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের জন্য এই বিক্ষোভ অন্যতম গুরুতর চ্যালেঞ্জ। তবে বিপ্লবী গার্ডসহ শক্তিশালী দমনযন্ত্র সরকারের হাতে থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থার পতন ঘটবে কি না—সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

এনএনবাংলা/পিএইচ