বাংলাদেশে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন (সত্য ও পুনর্মিলন) উদ্যোগ নেওয়ার উপযুক্ত সময় এখনও আসেনি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, সাবেক স্বৈরাচারী শাসকদের মধ্যে এখনো কোনো অনুশোচনা বা অনুতাপ দেখা যাচ্ছে না। বরং জুলাইয়ের আন্দোলনে নিহত তরুণদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে তারা বাস্তবতা অস্বীকার করে চলেছে, যদিও তাদের বর্বর অপরাধের বিপুল প্রমাণ রয়েছে।
মঙ্গলবার রাতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় যুক্তরাষ্ট্রের দুই সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক আলবার্ট গম্বিস ও মর্স ট্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে প্রধান উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা এই দুই কূটনীতিক দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ-পরবর্তী সময়ের মতো বাংলাদেশে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব কি না—সে বিষয়ে জানতে চান। জবাবে অধ্যাপক ইউনূস জানান, নেলসন ম্যান্ডেলার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার এই প্রক্রিয়া গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তবে বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশে এমন উদ্যোগ শুরু করার পরিবেশ তৈরি হয়নি।
তিনি বলেন, ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন তখনই সম্ভব, যখন অপরাধের দায় স্বীকার করা হয়, অনুশোচনা ও অনুতাপ প্রকাশ পায় এবং সেই অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। প্রশ্ন হলো—এই পরিস্থিতিতে কোথা থেকে শুরু করা যাবে?
প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠকে আসন্ন নির্বাচন ছাড়াও জুলাই আন্দোলন ও এর পরবর্তী পরিস্থিতি, তরুণ আন্দোলনকারীদের উত্থান, জুলাই সনদ ও গণভোট, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভুয়া খবর ও অপতথ্য, রোহিঙ্গা সংকট এবং ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রধান উপদেষ্টা জানান, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারিতেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে—নির্ধারিত সময়ের এক দিন আগেও নয়, এক দিন পরেও নয়। নির্বাচনকে ঘিরে পরিকল্পিতভাবে ভুয়া খবর ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার নির্ধারিত সময়েই নির্বাচন আয়োজন এবং ফল ঘোষণার পর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
তিনি বলেন, নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে। নির্বাচনকালীন সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবে এবং প্রশাসন থাকবে পক্ষপাতমুক্ত। সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকার প্রচার চালাচ্ছে উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, জনগণের সমর্থনে জুলাই সনদ অনুমোদিত হলে তা গণতান্ত্রিক শাসনের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে এবং ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রের পুনরাবৃত্তির কোনো সুযোগ থাকবে না।
তিনি আরও বলেন, সাবেক স্বৈরাচারী শাসনের সমর্থকরা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ভুয়া খবর ও অপতথ্য ছড়াচ্ছে। তবে জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন এবং ধীরে ধীরে এআই-সৃষ্ট বিভ্রান্তিকর ভিডিও শনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছে।
এ বিষয়ে একমত পোষণ করে সাবেক ভারপ্রাপ্ত আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট আলবার্ট গম্বিস বলেন, বিশ্বজুড়ে ভুয়া খবর এখন গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান শত্রুতে পরিণত হয়েছে। এই হুমকি মোকাবিলায় আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
দুই কূটনীতিকই গত দেড় বছরে দেশ পরিচালনায় প্রধান উপদেষ্টার ভূমিকার প্রশংসা করেন। বৈঠকে এসডিজি সমন্বয়ক ও জ্যেষ্ঠ সচিব লামিয়া মোরশেদ উপস্থিত ছিলেন।
শিপিং করপোরেশনকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরে রাখার আহ্বান
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনকে (বিএসসি) শক্তিশালী ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বিএসসির ছয়টি জাহাজ ক্রয় প্রকল্পের জন্য গৃহীত ঋণ পরিশোধ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঘোষিত লভ্যাংশ বাবদ সরকারের প্রাপ্য ২০৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকার চেক হস্তান্তর অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন ও বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক প্রধান উপদেষ্টার হাতে চেক তুলে দেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিএসসি যেভাবে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এমনভাবে নিতে হবে, যাতে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয় দিয়েই বিএসসিকে আরও শক্তিশালী করা যায় এবং বহরে নতুন জাহাজ যুক্ত করা সম্ভব হয়।
তিনি আরও বলেন, বিএসসির বহরে নতুন জাহাজ যুক্ত হলে নাবিকদের মধ্যে উৎসাহ বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি বিশ্বমানের নাবিক তৈরির লক্ষ্যে মেরিন একাডেমিগুলোর প্রশিক্ষকদের যথাযথ সম্মানী দিয়ে ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সাগর সংরক্ষণ ও টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনায় সমঝোতা স্মারক
সাগর সংরক্ষণ, সামুদ্রিক মৎস্য রক্ষা এবং টেকসই সুনীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে মহেশখালী ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (মিডা) ও জাপানের সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের (এসপিএফ) মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে এই সমঝোতা স্মারকে সই করেন মিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এবং এসপিএফের অধীন ওশান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ওপিআরআই) সভাপতি অধ্যাপক মিৎসুতাকু মাকিনো।
অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সাগর আমাদের একটি বিশাল সম্পদ, কিন্তু দিন দিন এটি দূষিত হয়ে উঠছে। সমুদ্রের কয়েক হাজার মিটার গভীরেও এখন প্লাস্টিক বর্জ্যের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে। এই সমঝোতা সাগর রক্ষা ও পরিষ্কার রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
তিনি আরও বলেন, সামুদ্রিক গবেষণায় বিশ্বজুড়ে সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশন অত্যন্ত সম্মানিত একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের সঙ্গে গবেষণা সহযোগিতা নিয়ে আমরা আনন্দিত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স ইনস্টিটিউট এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থাকবে এবং ভবিষ্যতে এই সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হবে।
সমঝোতার আওতায় সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশন মহেশখালীর তিনটি গ্রামকে ‘উমিগিও’—সামুদ্রিক শিল্পভিত্তিক কমিউনিটি উন্নয়ন ধারণা অনুসারে—মডেল মৎস্য গ্রাম হিসেবে গড়ে তুলতে মিডাকে সহায়তা করবে। পাশাপাশি জাপানের সুনীল অর্থনীতির মডেল অনুসরণ করে মেরিকালচার, সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং জেলেদের কল্যাণে যৌথভাবে কাজ করা হবে।
এনএনবাংলা/পিএইচ

আরও পড়ুন
ইসির সীমানা অনুযায়ী ১২ ফেব্রুয়ারিই পাবনার দুই আসনে নির্বাচন
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশের দাবিতে ফের সড়ক অবরোধ, ভোগান্তিতে নগরবাসী
‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে তরুণরা পাবে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ: আলী রীয়াজ