Monday, January 19th, 2026, 4:20 pm

খুলনা  জেলা পরিষদ যেন  দুর্নীতির সাম্রাজ্য

খুলনা প্রতিনিধি:

প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে বিতর্কের কেন্দ্রে খুলনা জেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাছলিমা আক্তার। একাধিক লিখিত অভিযোগ, তদন্তের নির্দেশ এবং বদলির আদেশের পরও ‘অদৃশ্য খুঁটির’ জোরে তিনি বহাল রয়েছেন নিজ পদে। অভিযোগকারীদের ভাষায়—এখন খুলনা জেলা পরিষদে দুর্নীতির গাড়ি ছুটছে কোনো ব্রেক ছাড়াই।

জেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, বিধিমালা অনুযায়ী উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, বিল অনুমোদন ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কমিটি ও আর্থিক ক্ষমতার সীমা থাকলেও তাছলিমা আক্তার সেসব নিয়ম পাশ কাটিয়ে মোটা অংকের কমিশনের বিনিময়ে বিল অনুমোদন দিচ্ছেন। নিজের ইচ্ছামতো আয়-ব্যয়ের অনুমোদন, প্রকল্পে স্বচ্ছতার অভাব এবং হিসাব-নিকাশে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগ আরও গুরুতর। সরকারি বাসা মেরামতের নামে অর্থ উত্তোলন, কনডেমড (ব্যবহার অনুপযোগী) ঘোষিত বাসায় বিধিবহির্ভূত সংস্কার এবং ব্যক্তিগত কাজে সরকারি গাড়ির নির্বিচার ব্যবহার—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার নিয়ে। অভিযোগ সূত্র জানায়, খুলনা জেলা পরিষদে যোগদানের পর তাছলিমা আক্তার জেলা পরিষদের সচিবের জন্য নির্ধারিত সরকারি বাসাটি নিজের থাকার জন্য আবেদন করেন। কর্তৃপক্ষকে ভুল বুঝিয়ে বাসাটি কনডেমড দেখিয়ে মাত্র ৫ হাজার টাকা মাসিক ভাড়ায় বরাদ্দ নেন। পরে বাসাটি সংস্কারের নামে ছয়জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর বাসা মেরামত দেখিয়ে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়।

অভিযোগএখানেই শেষ নয়। বাসায় দোলনা স্থাপনের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প দেখিয়ে আরও ১ লাখ টাকা ব্যয়ে আলাদা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। অথচ বিধি অনুযায়ী কনডেমড বাসায় এ ধরনের সংস্কার বা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের সুযোগ নেই বলেই জানায় জেলা পরিষদের একাধিক সূত্র।

সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে বাজার করা, পারিবারিক ভ্রমণ, মেয়েকে স্কুলে আনা–নেওয়া, স্বামীকে কলেজে পৌঁছে দেওয়া, আত্মীয়স্বজনের মালামাল পরিবহন, এমনকি মেয়েদের সাঁতার শেখাতে সুইমিং পুলে যাতায়াত—সবই করা হয়েছে সরকারি গাড়িতে। অভিযোগ রয়েছে, বাসার পানিও পরিবহন করা হয়েছে সরকারি গাড়িতে। জেলা পরিষদের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সামান্য প্রশাসনিক প্রশ্ন বা বিধি অনুযায়ী মতামত দিলেই শোকজ নোটিশ দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। গত কয়েক মাসে একাধিকবার তুচ্ছ বিষয়ে শোকজ করা হয়েছে। “ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে আমাদের সবাইকে কার্যত জিম্মি করে রাখা হয়েছে। নিয়মের কথা বললেই শাস্তির ভয় দেখানো হয়।”বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, একাধিক অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ২১ জুলাই মাঠ প্রশাসন শৃঙ্খলা শাখার উপসচিব মোহাম্মদ সাহেদুল ইসলাম খুলনার বিভাগীয় কমিশনারকে তদন্ত সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন। কিন্তু রহস্যজনকভাবে সেই তদন্ত আজও আলোর মুখ দেখেনি।

এরপর ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর তাছলিমা আক্তারকে চুয়াডাঙ্গা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে বদলির আদেশ দেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি। তিনি বহাল তবিয়তে থেকে গেছেন খুলনা জেলা পরিষদেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাছলিমা আক্তারের শ্বশুর চৌধুরী রমজান শরীফ বাদশা যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ছিলেন এবং উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন। এছাড়া অভিযোগ উঠেছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তাছলিমা আক্তার ইসলামপন্থী একটি বিশেষ গোষ্ঠীর পক্ষে বিভিন্ন ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন, যা সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশের জন্য হুমকি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে তাছলিমা আক্তার বলেন, দাপ্তরিক অবহেলার কারণে শোকজ করা হয়েছে। সব প্রকল্পই নিয়ম মেনে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত হয়েছে। চুয়াডাঙ্গায় বদলির বিষয়ে তিনি বলেন, বদলি হয়েছিল, তবে বর্তমানে আমি খুলনা জেলা পরিষদেই কর্মরত। শ্বশুরের রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়ে তিনি তা স্বীকার করেন। প্রশ্ন থেকেই যায়- একাধিক অভিযোগ, তদন্তের নির্দেশ, বদলির আদেশ—সবকিছুর পরও একজন বিতর্কিত কর্মকর্তা কীভাবে একই পদে বহাল থাকেন? তদন্ত কেন থেমে যায়? কার আশ্রয়ে প্রশাসনিক নিয়ম বারবার ভেঙে পড়ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না মিললে খুলনা জেলা পরিষদে স্বচ্ছতা ও সুশাসনের দাবি কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।