Sunday, January 25th, 2026, 6:07 pm

বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের ৭৩ গণমাধ্যমের ১৪০টি প্রতিবেদনে অপতথ্যের প্রমাণ: রিউমর স্ক্যানার

 

বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে ভারতীয় উৎস থেকে ছড়ানো অপতথ্যের প্রবণতা ২০২৫ সালে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক প্ল্যাটফর্মে অন্তত ১৫৫টি অপতথ্য ছড়ানোর প্রমাণ মিলেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেশি।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমের সক্রিয় অংশগ্রহণ। গত বছর ৭৩টি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ৩৮টি ঘটনায় মোট ১৪০টি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছে।

রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জানুয়ারি ২০২৫ মাসেই এককভাবে ৩৪টি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। পরবর্তী মাসগুলোতে কিছুটা ওঠানামা থাকলেও, পুরো বছরজুড়ে গড়ে প্রতি মাসে অন্তত ১৩টি অপতথ্য ছড়ানোর প্রমাণ মিলেছে।

সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা

বাংলাদেশবিরোধী অপতথ্যের প্রচারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে মাইক্রোব্লগিং সাইট এক্স (সাবেক টুইটার)। ১৫৫টি শনাক্ত অপতথ্যের মধ্যে ১২৬টি (প্রায় ৮১%) ছড়ানো হয়েছে এক্সে। এছাড়া ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, থ্রেডস ও টিকটকেও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হয়েছে।

সাম্প্রদায়িক অপতথ্য

অপতথ্যের মধ্যে ৯১টি (প্রায় ৫৮%) ছিল সাম্প্রদায়িক ভিত্তিক। ভারতের গণমাধ্যমও অন্তত ১০টি ঘটনায় বাংলাদেশকে জড়িয়ে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য প্রচার করেছে। এ ধরনের অপতথ্যে অংশ নিয়েছে এনডিটিভি, দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, জি নিউজ, ওয়াল্ড ইজ ওয়ান নিউজ, ইন্ডিয়া টুডে, হিন্দুস্তান টাইমস, নিউজ১৮, টিভি নাইন, এবিপি, মিরর নাউ ইত্যাদি।

ভুল তথ্যের প্রধান উদাহরণ

  • আজতক বাংলা স্যাটেলাইট চ্যানেল সর্বোচ্চ ভুল তথ্য ছড়িয়েছে; ৩২টি ঘটনার মধ্যে ১০টিতে ভুল তথ্য প্রচার।
  • ৯ জুলাই ঢাকায় ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ (সোহাগ) হত্যাকাণ্ড নিয়ে অন্তত ২৭টি ভারতীয় গণমাধ্যমে মিথ্যা দাবি করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছিল সোহাগ হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিলেন।
  • প্রায়শই দেখা গেছে, কোনো মুসলিম বাংলাদেশিকে হামলার শিকার হলে তাকে হিন্দু দাবি করে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য হিসেবে প্রচার করা হয়েছে (৩৩টি ঘটনা)।
  • পুরোনো ঘটনা নতুন সাম্প্রদায়িক হামলার মতো চালানো হয়েছে (৮টি ঘটনা)।
  • বিনোদনমূলক স্ক্রিপ্টেড কনটেন্টকেও সত্য দাবি করে অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে (৬টি ঘটনা)।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক রাজীব নন্দী বলেন, “বাংলাদেশে মব ভায়োলেন্সের লাগামহীন বৃদ্ধি, ধারাবাহিক সাম্প্রদায়িক হামলা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে দৃঢ় প্রতিক্রিয়ার অভাব ভারতীয় মিডিয়ার অতিরঞ্জনের জন্য বাস্তব কাঁচামাল সরবরাহ করছে। যদি বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা সহিংসতার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান না নেয়, তবে ভবিষ্যতেও এই ধরনের অপপ্রচার চালু থাকবে।”

তবে রাজীব এটাও মনে করেন যে ভিজ্যুয়াল অতিরঞ্জন, নাটকীয় ভাষা ও যাচাইহীন তথ্য মিলিয়ে একটি আবেগনির্ভর ও সংঘাতমুখী আখ্যানের জায়গায় ভারতীয় গণমাধ্যম নৈতিক সীমা লঙ্ঘন করছে।

ভারতীয় সাংবাদিক অর্ক ভাদুড়ী মনে করেন, ফ্যাক্টচেকিং এবং দুদেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ গড়ে তোলা একমাত্র কার্যকর উপায় এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য।

পরিসংখ্যান সংক্ষেপ

  • ৭৩ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ১৪০টি ভুল প্রতিবেদন
  • ১৫৫টি মোট অপতথ্য
  • ৯১টি সাম্প্রদায়িক অপতথ্য
  • এক্সে ১২৬টি, ফেসবুকে ৫৪টি অপতথ্য

এনএনবাংলা/