বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং ৭৮৭-৯ উড়োজাহাজে বারবার যান্ত্রিক ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণে অনিয়মের ঘটনা সামনে এসেছে। বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে এয়ারক্রাফটটি বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একই এয়ারক্রাফট ব্যবহার করেই ভিভিআইপি ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। ওই ফ্লাইটে তৎকালীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) তারেক রহমানকে ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে বহন করে আনা হয়।
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স । কমিটির জমা দেওয়া প্রতিবেদনে এয়ারক্রাফটটির রক্ষণাবেক্ষণ ও ত্রুটি ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়ম ও গাফিলতির তথ্য উঠে এসেছে।
তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন বিমানের উপপ্রধান প্রকৌশলী (বেস মেইনটেন্যান্স) মো. মনসুরুল আলম। কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন ব্যবস্থাপক (ফাইন্যান্স) আবদুল্লাহ আল মামুন এবং সদস্য হিসেবে ছিলেন উপমহাব্যবস্থাপক, প্রশিক্ষণ (এয়ারক্রাফট/অ্যারো) মো. জুবিয়ারুল ইসলাম।
প্রতিবেদনটির একটি কপি ঢাকা পোস্টের হাতে এসেছে। এছাড়া প্রতিবেদনটি বিমানে জমা পড়েছে বলে নিশ্চিত করেছে বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেটেরিয়াল ম্যানেজমেন্ট বিভাগ। তবে এ বিষয়ে বিমানের কোনো কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বিমানের দুই প্রকৌশলী হীরালাল ও মো. সাইফুজ্জামান খানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৯ ও ১৭ ডিসেম্বর এয়ারক্রাফটটির রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে একাধিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। নথি অনুযায়ী, ১০ ডিসেম্বর রক্ষণাবেক্ষণের কাজ মাত্র দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে শেষ করা হয়। অথচ বোয়িং নির্মিত ৭৮৭-৯ উড়োজাহাজের জন্য নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী এটি অস্বাভাবিকভাবে কম সময় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
রক্ষণাবেক্ষণে অনিয়ম, দুর্ঘটনার আশঙ্কা
তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, এয়ারক্রাফটটির ত্রুটি নির্ণয় ও কার্যকারিতা পরীক্ষার বিস্তারিত লগ এবং সংশ্লিষ্ট জনবলের রেকর্ড উপস্থাপন করা যায়নি। বিষয়টিকে গুরুতর অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব ছিল। মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে একই ধরনের ত্রুটি তিনবার দেখা দিলেও সেটিকে পুনরাবৃত্তিমূলক ত্রুটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
সাধারণত বিমানের সিস্টেম সর্বশেষ ২৭টি ফ্লাইটের তথ্য সংরক্ষণ করে। কিন্তু তদন্ত শুরুর সময় প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায়নি। এতে গুরুত্বপূর্ণ যান্ত্রিক তথ্য যথাসময়ে সংগ্রহ বা সংরক্ষণ করা হয়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২১ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে সিলেটগামী বিজি-২০২ ফ্লাইট আকাশে থাকার সময় আবারও ভিএফএসজি বিকল হয়ে যায়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের ত্রুটির কারণে অগ্নিকাণ্ড বা গিয়ারবক্সে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকৌশল বিভাগের ভুল ত্রুটি নির্ণয়ের কারণে এমন একটি বিমানকে ভিভিআইপি ফ্লাইটে ব্যবহার করায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছিল।
এছাড়া বারবার যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন, অন্য বিমান থেকে যন্ত্রাংশ খুলে এনে ব্যবহার, অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ এবং পরিবহন ব্যয়সহ বিভিন্ন কারণে মোট প্রায় ২৬ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির মতে, এটি কেবল একটি যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপনের ঘটনা নয়; বরং পুরো ব্যবস্থাপনার সমন্বিত ব্যর্থতারই প্রতিফলন
দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ
তদন্ত প্রতিবেদনে বিমানের প্রকৌশলী হীরালাল ও মো. সাইফুজ্জামান খানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কমিটির মতে, ত্রুটি সংশোধন এবং বিমানটিকে পুনরায় পরিষেবায় ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও যাচাই-বাছাই করেননি।
বিশেষ করে কম ফুয়েল প্রেসারের সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও বিমানটিকে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দেওয়াকে গুরুতর সিদ্ধান্তগত ত্রুটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।
এনএনবাংলা/পিএইচ


আরও পড়ুন
‘গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী’ সম্মাননায় ভূষিত হচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়া
বিএনপি সংসদের খারাপ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে চায়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বিশ্ব অর্থনীতিতে অশনিসংকেত: দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ জ্বালানি তেলের দাম