Thursday, April 16th, 2026, 5:22 pm

ইরান যুদ্ধ ‘শেষের দিকে’, বাড়ছে ‘চুক্তির আশা’

 

ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষের দিকে এগোচ্ছে—এমন আশাবাদ এখন কূটনৈতিক মহলে বাড়ছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, পাকিস্তানের একজন গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী ‘জটিল বিষয়গুলোতে’ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছেন।

পাকিস্তানের কর্মকর্তারা আশা করছেন, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান আলোচনায় বড় ধরনের অগ্রগতি আসতে পারে। এই আশাবাদের খবর এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল তেহরান সফর করছিল।

তবে ইরান স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এখনো চূড়ান্ত কোনো সমাধানে পৌঁছায়নি।

ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির বুধবার তেহরানে পৌঁছান এবং সেখানে তিনি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে জানান, এই সফরের ফলে দ্বিতীয় দফা আলোচনার সম্ভাবনা এবং চলমান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি আরও বাড়তে পারে। তবে পারমাণবিক ইস্যুতে মৌলিক মতপার্থক্য এখনও রয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান উভয়ই ছয় সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাত নিরসনে একটি চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান প্রকাশ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, চুক্তি হলে হরমুজ প্রণালী স্থায়ীভাবে উন্মুক্ত হতে পারে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আলোচনায় ফেরার বিষয়ে দুই পক্ষই সম্মত হয়েছে, তবে এখনো কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক হয়নি।

‘যুদ্ধ শেষের খুব কাছাকাছি’—ট্রাম্পের মন্তব্য

কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার হয়েছে ট্রাম্পের ইতিবাচক মন্তব্যের পর। তিনি মঙ্গলবার বলেন, বিশ্বকে খুব শিগগিরই ‘অসাধারণ দুই দিনের’ জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে এবং ইরান যুদ্ধ শেষের খুব কাছাকাছি।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি বলেন, পরবর্তী আলোচনা ইসলামাবাদে হতে পারে এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনা ইতিবাচক ও চলমান রয়েছে। তারা একটি চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নিশ্চিত করেছে যে, ইসলামাবাদে আলোচনার পরও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত আছে। মুখপাত্র জানান, পাকিস্তানের মাধ্যমে কিছু বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে এবং ইরানের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

লেবানন পরিস্থিতি ও যুদ্ধবিরতি প্রসঙ্গ

পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমানে কার্যকর দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে লেবানন পরিস্থিতিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং শান্তি প্রক্রিয়ায় লেবাননে স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ।

একজন জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, ইসরায়েলের মন্ত্রিসভা লেবাননে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করেছে। একই সময়ে ট্রাম্প জানান, বহু দশক পর ইসরায়েল ও লেবাননের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে যোগাযোগ হতে যাচ্ছে।

লেবাননের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির আলোচনা চলছে বলে তারা অবহিত হলেও এর বিস্তারিত সময়সূচি এখনো পরিষ্কার নয়।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন দেশটির নিরাপত্তা মন্ত্রী।

শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রভাব

সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার প্রত্যাশায় বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে উর্ধ্বগতি দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার এশিয়ার বাজারে সূচক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। একইভাবে ওয়াল স্ট্রিটেও বুধবার রেকর্ড উচ্চতা ছুঁয়েছে, কারণ তেলের বাজার স্থিতিশীল রয়েছে।

পারমাণবিক ইস্যুতে মূল বাধা

ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ ইসলামি বলেন, আলোচনার সফলতার জন্য ইরানের অধিকার, স্বার্থ ও মর্যাদা স্বীকৃত হতে হবে।

তিনি আরও বলেন, যদি আগের মতো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও অবিশ্বাসের পুনরাবৃত্তি হয়, তাহলে কোনো চুক্তি সফল হবে না।

গত সপ্তাহান্তের আলোচনায় প্রধান জটিলতা ছিল পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ। যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের জন্য সব পারমাণবিক কার্যক্রম স্থগিত রাখার প্রস্তাব দেয়, অন্যদিকে ইরান ৩ থেকে ৫ বছরের বিরতির প্রস্তাব দেয়।

ওয়াশিংটন চায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরান থেকে সরিয়ে নেওয়া হোক, আর তেহরান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে।

এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানান, আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হলেও এখনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি।

অন্য একটি সূত্রের মতে, ইরান IAEA ও যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পাতলা করতে রাজি হয়েছে।

অর্থনৈতিক চাপ ও হরমুজ প্রণালী পরিস্থিতি

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের জাহাজ ছাড়া অন্যদের চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। এতে উপসাগরীয় রপ্তানি কমে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানি তেল অর্থনীতিতে চাপ বাড়াতে বন্দরের জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জোরদার করেছে।

ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, অবরোধ চলতে থাকলে উপসাগর, ওমান সাগর এবং লোহিত সাগরে বাণিজ্য কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে।

এক সূত্র জানায়, চুক্তি হলে ইরান ওমানের পথ ব্যবহার করে জাহাজ চলাচল নিরাপদ করতে পারে।

উত্তেজনা এখনো বিদ্যমান

আলোচনার পরও হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ বহাল রয়েছে। সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কয়েকটি জাহাজ ফেরত পাঠানো হয়েছে।

ইরান এই অবরোধকে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। ফার্স নিউজ জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত একটি সুপারট্যাঙ্কার অবরোধ অতিক্রম করেছে, তবে বিস্তারিত জানায়নি।

ইরানের সামরিক কমান্ডার আলি আবদুল্লাহি আবারও সতর্ক করে বলেছেন, অবরোধ না উঠলে আঞ্চলিক বাণিজ্যে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে এবং লোহিত সাগর, উপসাগর ও ওমান সাগরে বাণিজ্য আটকে দেওয়ার হুঁশিয়ারি রয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা

এনএনবাংলা/পিএইচ