ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী (পিয়ন) জাহাঙ্গীর আলমের মালিকানাধীন প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা মূল্যের জমি ও ফ্ল্যাট জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি তার স্ত্রী কামরুন নাহারের নামে থাকা সাতটি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশও দেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পৃথক আবেদনের শুনানি শেষে মঙ্গলবার ঢাকার মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. সাব্বির ফয়েজ এ আদেশ দেন।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী রিয়াজ হোসেন জানান, জাহাঙ্গীর আলমের নামে নোয়াখালী সদর উপজেলা ও চাটখিল উপজেলায় মোট ৩৫ শতাংশ জমি জব্দ করতে বলা হয়েছে। এসব জমির বাজারমূল্য ধরা হয়েছে এক কোটি ৩৩ লাখ ৭৪ হাজার ৭৪০ টাকা। একই সঙ্গে মিরপুরে অবস্থিত ১ হাজার ৩৮৫ বর্গফুট আয়তনের একটি ফ্ল্যাটও জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যার মূল্য ৪১ লাখ ৮২ হাজার টাকা।
এ ছাড়া জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী কামরুন নাহারের নামে থাকা সাতটি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এসব হিসাবে মোট এক কোটি তিন লাখ ৫৩ হাজার ৩৬৯ টাকা জমা রয়েছে বলে আদালতকে জানানো হয়।
জমি ও ফ্ল্যাট জব্দ এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের জন্য দুদকের সহকারী পরিচালক পিয়াস পাল আদালতে আবেদন করেন। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ১৮ কোটি ২৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত নামে ও মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৬২৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক মামলা করেছে এবং সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তার সম্পদ জব্দ করা জরুরি বলে আবেদনে বলা হয়।
কামরুন নাহারের বিষয়ে আবেদনে বলা হয়, তার বিরুদ্ধে ছয় কোটি ৮০ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। তার নামে খোলা সাতটি সঞ্চয়ী ও ডিপিএস হিসাবে মোট পাঁচ কোটি ৯৬ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়ায় দুদক তার বিরুদ্ধেও পৃথক মামলা করেছে। এ কারণে তদন্ত চলাকালে এসব হিসাব অবরুদ্ধ করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে দুর্নীতি নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে শেখ হাসিনা তার বাসায় কর্মরত এক পিয়নের বিপুল সম্পদের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমার বাসায় কাজ করেছে, পিয়ন ছিল সে। এখন সে ৪০০ কোটি টাকার মালিক। হেলিকপ্টার ছাড়া চলে না। কীভাবে এত টাকা বানাল—জানতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়েছি।’ সে সময় নাম উল্লেখ না করা হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাহাঙ্গীর আলমকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তীতে তার ব্যাংক হিসাব স্থগিতের নির্দেশ আসে।
জাহাঙ্গীর আলম টানা দুই মেয়াদে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠায় তাকে ওই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। শেখ হাসিনা বিরোধী দলে থাকাকালীন সময়েও তিনি তার ব্যক্তিগত স্টাফ হিসেবে কাজ করেছেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর জন্য বাসা থেকে খাবার ও পানি বহনের দায়িত্বে থাকার কারণে তিনি ‘পানি জাহাঙ্গীর’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার খিলপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম একসময় চাটখিল উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি নৌকার প্রার্থী হতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন। পরে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী পরিচয় ব্যবহার করে তদবিরের মাধ্যমে তিনি বিপুল অর্থের মালিক হন এবং নোয়াখালী ও ঢাকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদ গড়ে তোলেন। এ অবস্থায় ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জারি করা এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই।
জুলাইয়ের গণআন্দোলনের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের ঘোষণা দেয় দুদক। মামলার আগে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। সেখানে বলা হয়, তিনি নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার খিলপাড়া ইউনিয়নের নাহারখিল গ্রামের বাসিন্দা এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। একসময় তিনি জাতীয় সংসদ ভবনে দৈনিক মজুরিতে কাজ করতেন।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই জাহাঙ্গীর আলমের আর্থিক অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-১ (চাটখিল–সোনাইমুড়ী) আসন থেকে প্রার্থী হতে তিনি মনোনয়নপত্র জমা দেন। হলফনামায় তিনি নিজের নামে প্রায় ২১ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য দেন এবং তার স্ত্রী কামরুন নাহারের নামে দেখানো হয় সাত কোটি ৩০ লাখ টাকার সম্পদ।
এর আগে গত বছরের ৩০ জানুয়ারি আদালত জাহাঙ্গীর আলম ও তার স্ত্রী কামরুন নাহারের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
এনএনবাংলা/পিএইচ

আরও পড়ুন
দেশ ছেড়ে পালাতে হয়, এমন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চাই না : রিজওয়ানা হাসান
তারেক রহমানের সঙ্গে রুশ রাষ্টদূতের বৈঠক
বাসর রাতে কনে মুখ ধোয়ার পরই চমকে ওঠেন বর, অভিযোগ গড়াল আদালতে