Tuesday, April 14th, 2026, 5:26 pm

নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন, শঙ্কা ও অনিশ্চয়তায় মধ্যবিত্তরা

 

নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী বাজারে নতুন করে চাপে পড়েছে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি। একদিকে কমেছে ভোক্তার আয়, অন্যদিকে যুদ্ধের প্রভাবে পরিবহন খরচসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে এবং মধ্যবিত্তরা খরচ কমিয়ে বাধ্য হচ্ছেন জীবনমান কমাতে। তেলের দাম বাড়ার কারণে ভবিষ্যতে চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে দাঁড়ালেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। অন্যদিকে মজুরি বেড়েছে মাত্র ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম। ফলে মানুষকে ঘাটতি পূরণ করতে ঋণ নিতে হচ্ছে বা খরচ কমাতে হচ্ছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে পুষ্টিহীনতা ও শিক্ষার মান কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু সেই হারে আয় না বাড়ায় মানুষ সঞ্চয় ভেঙে বা ঋণ করে চলতে বাধ্য হচ্ছে। তবে দরিদ্র মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন, কারণ তাদের সঞ্চয় বা ধার নেওয়ার সুযোগ নেই।

এদিকে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান চাকরিও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। ফলে আয় কমে বেকারত্ব বাড়ছে এবং মানুষের জীবনযাত্রা আরও নিম্নমুখী হয়ে পড়ছে।

ডলারের দাম বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি এবং জাহাজ ভাড়া প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের বাজারে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেলে রেশনিং চালু হওয়ায় পরিবহন খরচ বেড়েছে। ট্রাক ভাড়া আগের তুলনায় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সব ধরনের পণ্যের দামে প্রভাব ফেলছে।

রাজধানীর বাজারে দেখা গেছে, ব্রয়লার মুরগি কেজি ২১০ টাকা, সোনালি মুরগি ৪৩০-৪৪০ টাকা এবং গরুর মাংস ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাছের দামও বেশ চড়া, প্রতি কেজি ২০০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে। ভোজ্যতেলের বাজারেও অস্থিরতা বিরাজ করছে; খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ২১০-২২০ টাকা, যা এক মাস আগেও ছিল ১৮৫ টাকা। চিনির দাম বেড়ে হয়েছে ১০৫ টাকা কেজি।

চালের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও দাম কমেনি। মোটা চাল ৫৬-৫৮ টাকা, বিআর-২৮ চাল ৬৮ টাকা এবং মিনিকেট চাল ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডালের দামও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, মসুর ডাল ১১০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।

সবজির বাজারেও ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে ২০-৩০ টাকা বেড়েছে। বেগুন ১২০ টাকা, পটোল ১০০ টাকা, করলা ১০০-১২০ টাকা এবং ঢ্যাঁড়শ, বরবটি ৮০-৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মূলত পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

এদিকে রান্নার গ্যাসের দামও বড় ধাক্কা দিয়েছে ভোক্তাদের। ১২ কেজি এলপিজির দাম এক লাফে বেড়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বাজারে অনেক ক্ষেত্রে ২ হাজার টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি বাজার সিন্ডিকেটও পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে। তাই বাজারে কঠোর তদারকি জরুরি।

অন্যদিকে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং অবৈধ মুনাফার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এনএনবাংলা/