Wednesday, April 22nd, 2026, 3:35 pm

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে সার সরবরাহে বিঘ্ন, বিশ্বজুড়ে চরম খাদ্যসংকটের আশঙ্কা

ছবি: জেমিনি

 

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা শুধু জ্বালানি খাতেই প্রভাব ফেলছে না, বরং বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থাকেও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান সিটাস মেরিটাইমের চিফ অপারেটিং অফিসার অলিভিয়া লেনক্স-কিং সতর্ক করে জানিয়েছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়ে সারের সরবরাহ ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে।

গতকাল মঙ্গলবার হংকংয়ের ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, বর্তমানে ড্রাই বাল্ক শিপিং শিল্পের অন্যতম বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে সারের বাজার। বিশেষ করে বহুল ব্যবহৃত ইউরিয়া সারের বৈশ্বিক বাণিজ্য এই সংঘাতের কারণে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

উপলব্ধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ইউরিয়া চাহিদার প্রায় ১২ শতাংশ পূরণ হয় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে, যা বর্তমানে প্রায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ইউরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদক দেশ চীন তাদের সার কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে ইউরিয়া সারের ঘাটতি আরও তীব্র হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি যদি বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত স্থায়ী হয়, তাহলে সারের অভাব ও ক্রমবর্ধমান মূল্য ফসল উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। এতে বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট সার বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সম্পন্ন হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে সারের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই সম্ভাব্য মানবিক বিপর্যয় সম্পর্কে সতর্ক করে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, জ্বালানি ও সারের দাম এভাবে বাড়তে থাকলে বছরের মধ্যভাগ নাগাদ অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ তীব্র ক্ষুধার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী দিনে বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এখন আর শুধু আঞ্চলিক সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথগুলো ব্যাহত হওয়া এবং সরবরাহব্যবস্থার ভেঙে পড়ার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি, সার ও খাদ্যের দাম দ্রুত বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে আফ্রিকার দেশগুলো এই পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব অনুভব করছে।

আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, খাদ্য ও জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল আফ্রিকার অনেক ঝুঁকিপূর্ণ দেশের খাদ্যনিরাপত্তা এখন চরম হুমকির মুখে। মর্সি ক্রপসের আফ্রিকাবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট মেলাকু ইয়ারগা সিএনএনকে জানান, ইরানকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই সংকট ইথিওপিয়া, সুদান ও সোমালিয়ার মতো দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত কঠিন সময় নিয়ে এসেছে। এসব দেশের লাখ লাখ মানুষ আগেই খরা, ক্ষুধা, বাস্তুচ্যুতি ও অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে দুর্ভোগে রয়েছে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, সোমালিয়া ও সুদানে গত কয়েক বছরে দুর্ভিক্ষসদৃশ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশ দুটি আবারও মারাত্মক খাদ্যসংকটে পড়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

সংস্থাটি আরও আশঙ্কা করছে, বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তীব্র ক্ষুধার্ত মানুষের তালিকায় যুক্ত হতে পারে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এমন এক সময় এই সংকট দেখা দিয়েছে যখন আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো মারাত্মক তহবিল সংকটে ভুগছে। ইয়ারগা সতর্ক করে বলেন, বিশ্ব হয়তো ‘সহায়তা-পরবর্তী যুগের’ প্রথম বড় সংকটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে—যেখানে মানুষের প্রয়োজন বাড়লেও সেই অনুযায়ী সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, এই উত্তেজনা আরও কয়েক মাস স্থায়ী হলে পরিস্থিতির পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। এটি শুধু বপন মৌসুমকে ব্যাহত করবে না, বরং খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করবে। ইতোমধ্যেই সীমিত সামর্থ্যে কাজ করা সাহায্য সংস্থাগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে, যা বহু মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।

সূত্র: সিএনএন

এনএনবাংলা/পিএইচ