বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান মন্তব্য করেছেন, বিএনপি বর্তমানে বিভিন্ন বিষয়ে এমন অবস্থান নিচ্ছে, যা পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিবাদের পথ অনুসরণের শামিল।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, একসময় বিএনপির সঙ্গে জামায়াত একইভাবে নিপীড়িত ছিল। তিনি বিনয়ের সঙ্গে বিএনপির উদ্দেশে বলেন, “আপনারা যতই চেষ্টা করুন, আওয়ামী লীগ হতে পারবেন না; বড়জোর দুর্বল আওয়ামী লীগে পরিণত হতে পারেন। যে আওয়ামী লীগ একসময় পুরো জাতি ও বিরোধী দলকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করত, আজ তাদের অবস্থা কী হয়েছে—তা সবাই দেখছে। অথচ আপনারা এখন একই ধরনের আচরণ শুরু করেছেন।”
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ তাদের অনুগত লাঠিয়াল বাহিনী ব্যবহার করে সমাজের বিভিন্ন স্তরে আধিপত্য কায়েম করেছিল। কিন্তু দুর্দিনে সেই লাঠিয়াল বাহিনী তাদের পাশে দাঁড়ায়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোয় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যেসব উদ্যোগ প্রয়োজন, সেসব বিষয়ে বিএনপি ধারাবাহিকভাবে বিরোধিতা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষায়, এটি জাতির সঙ্গে স্পষ্ট প্রতারণার সামিল।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি যে ৩১ দফা কর্মসূচি দিয়েছে, বাস্তবে তারা নিজেরাই সেই কর্মসূচির বিপরীতে অবস্থান নিচ্ছে। তার মতে, বিএনপি যে বিরোধিতা করছে—এই উপলব্ধিটুকুও তারা হারিয়ে ফেলেছে।
জামায়াত আমির বলেন, জুলাই আন্দোলন না হলে এবং বহু মানুষের আত্মত্যাগ না ঘটলে আজ বিএনপি ক্ষমতার সুযোগ ভোগ করতে পারত না। তিনি অভিযোগ করেন, ক্ষমতায় আসার আগেই বিএনপি শহীদ পরিবারগুলোর দুঃখ-দুর্দশার প্রতি যথাযথ মনোযোগ দেয়নি। ৫ আগস্টের পর ৭ আগস্ট দলীয় কার্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে নির্বাচন দাবি করলেও শহীদ পরিবার বা আহতদের নিয়ে কোনো কার্যকর কর্মসূচি তারা নেয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, যারা বিদেশে ছিলেন, তারাও দেশে ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছেন এই আন্দোলনের কারণে। আন্দোলন সফল হওয়ার পর কেউ কেউ নিজেদের ‘মাস্টারমাইন্ড’ দাবি করছেন—এ ধরনের দাবিকে তিনি ভুয়া বলে মন্তব্য করেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আন্দোলনে সবার অবদান ছিল এবং জামায়াত কখনো কারো ন্যায্য অবদান অস্বীকার করে না। তবে তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই আন্দোলনের নায়করাই শেষ পর্যন্ত জাতিকে মুক্তির পথে নিয়ে এসেছে। তাদের যথাযথ সম্মান ও ভালোবাসা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, আন্দোলনের সময় শ্রমিক, মা-বোনসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল। কেউ পানি সরবরাহ করেছে, কেউ সন্তান কোলে নিয়েও আন্দোলনে অংশ নিয়েছে—সেসব ত্যাগের কথা ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
জামায়াত আমির আরও বলেন, সংসদের প্রথম দিনেই তারা শপথ নিয়ে বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করলেও অন্যরা তা করেনি। জাতির সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে প্রতারণা করা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। পরবর্তীতে আলোচনার উদ্যোগ নিলেও বিএনপি তার বিরোধিতা করেছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, যেসব আইন সংশোধন ও অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন ছাড়া ফ্যাসিবাদী শাসনের পরিবর্তন সম্ভব নয়, বিএনপি সেগুলো আগের স্বৈরাচারী সরকারের মতোই রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং থানার ভেতরে ডাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর হামলার ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, এসব ঘটনার মাধ্যমে একটি স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যাচ্ছে—গণভোটের রায় অস্বীকার করার মধ্য দিয়েই বিএনপি ফ্যাসিবাদের পথে যাত্রা শুরু করেছে।
তিনি বলেন, তারা এমন একটি বাংলাদেশ চান না যেখানে মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। বরং এমন একটি দেশ চান, যেখানে শিশু, কিশোর, যুবক ও নারীরা নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের হাতে দা বা কুড়াল নয়, খাতা-কলম দেখতে চান বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
শেষে তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি এই পরিস্থিতি বন্ধ না করা হয়, তাহলে মনে রাখতে হবে—জুলাই কেবল ২০২৪ সালেই সীমাবদ্ধ নয়, প্রতি বছরই জুলাই ফিরে আসে। সেই জুলাই আবার ফিরে এলে চূড়ান্তভাবে ফ্যাসিবাদের কবর রচিত হবে। জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান দেখিয়ে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি জানান, দাবি আদায়ে তাদের লড়াই সংসদের ভেতরেও চলবে, আবার রাজপথেও অব্যাহত থাকবে।
এনএনবাংলা/পিএইচ


আরও পড়ুন
নির্যাতন বন্ধে সমাজ ও প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন প্রয়োজন : আইনমন্ত্রী
২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহে আরও ১১ জনের মৃত্যু
জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূলে কাজ করতে হবে: মির্জা ফখরুল