উত্তরার সাপ্পোরো ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতালের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করে ইন্টার্নশিপের অপেক্ষায় আছেন মো. ফয়সাল আহম্মেদ (২৬)। একই কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী কাজী জহুরুল ইসলাম ওরফে সৌমিক (২৫)। তবে পড়াশোনার পাশাপাশি তারা কয়েক বছর ধরে কলেজের শিক্ষার্থী ও অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে মানব কঙ্কাল বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ কাজে প্রায় সাতজনের একটি সক্রিয় চক্র কাজ করছিল। কবর থেকে লাশ উত্তোলন করে সেসব কঙ্কাল বিক্রি করতেন তারা।
সোমবার রাতে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের মণিপুরীপাড়া, তেজগাঁও কলেজ এলাকা ও উত্তরা থেকে ফয়সাল, সৌমিকসহ মোট ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৪৭টি মাথার খুলি এবং বিপুল পরিমাণ মানবদেহের হাড় ও কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ইবনে মিজান।
ডিসি মোহাম্মদ ইবনে মিজান বলেন, রমজান শুরুর পর থেকেই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে পুলিশ। সোমবার রাতে তেজগাঁও থানার একটি দল বিশেষ অভিযানের প্রস্তুতির সময় জানতে পারে, তেজগাঁওয়ের মণিপুরীপাড়ায় মানব কঙ্কাল বিক্রির চেষ্টা চলছে। পরে সেখানে গিয়ে এক ব্যক্তির সন্দেহজনক চলাফেরা দেখে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে তার কাছ থেকে একটি মানব কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। আটক ব্যক্তির নাম কাজী জহুরুল ইসলাম ওরফে সৌমিক (২৫)।
পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আরও কয়েকজন জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়। জানা যায়, তেজগাঁও কলেজের সামনে আরও দুই ব্যক্তি কঙ্কাল নিয়ে অবস্থান করছেন। সেখানে অভিযান চালিয়ে মো. আবুল কালাম (৩৯) ও আসাদুল মুন্সী (৩২) নামের দুইজনকে দুটি মানব কঙ্কালসহ গ্রেপ্তার করা হয়
ডিসি মিজান জানান, সৌমিক উত্তরার সাপ্পোরো ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতালের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। তবে গ্রেপ্তার হওয়া বাকি দুজন শিক্ষার্থী নন। তাদের মধ্যে আবুল কালামের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে কঙ্কাল উত্তোলনের অভিযোগে একটি মামলা হয়েছিল। এছাড়া তার বিরুদ্ধে মাদকসহ মানব কঙ্কাল উত্তোলন ও চুরির ঘটনায় বিভিন্ন থানায় মোট ২১টি মামলা রয়েছে। আসাদুল মুন্সীর বিরুদ্ধে রয়েছে দুটি মামলা।
গ্রেপ্তার তিনজনকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কথা স্বীকার করে। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, জব্দ হওয়া তিনটি কঙ্কাল ছাড়াও উত্তরার পশ্চিম থানার ৯ নম্বর সেক্টরে সাপ্পোরো ডেন্টাল কলেজের হোস্টেলের একটি কক্ষে আরও অনেক মাথার খুলি ও মানবদেহের হাড় রাখা আছে।
পরে সেখানে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন ব্যাগ ও বস্তায় রাখা আরও ৪৪টি মাথার খুলি এবং মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের হাড় উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে চক্রের মূল হোতা মো. ফয়সাল আহম্মেদকেও আটক করা হয়। তিনি সাপ্পোরো ডেন্টাল কলেজ থেকে ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে ইন্টার্নশিপের অপেক্ষায় ছিলেন।
জিজ্ঞাসাবাদে ফয়সাল জানান, ‘বোন্স সেলিং’ (হাড় বিক্রি) নামে তাদের একটি অনলাইন গ্রুপ রয়েছে। সেখানে প্রায় ৭০০ জন কাজ করে এবং গ্রুপটির সদস্য সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। গত কয়েক বছর ধরে তারা এই কঙ্কাল বিক্রির সঙ্গে জড়িত। কেউ কেউ ৫০টি, আবার কেউ ২০টি পর্যন্ত কঙ্কাল বিক্রি করেছেন। তাদের সঙ্গে আরও অনেক ব্যক্তি জড়িত, যারা কবর থেকে লাশ উত্তোলন করে কঙ্কাল সংগ্রহ করে।
পুলিশ জানায়, মূলত গাজীপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও জামালপুর এলাকা থেকে এসব কঙ্কাল সংগ্রহ করা হতো। মাঠপর্যায়ে ৬ থেকে ৮ হাজার টাকায় কঙ্কাল কিনে পরে সেগুলো ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করতেন তারা।
ডিসি ইবনে মিজান বলেন, কঙ্কাল বিক্রির বিষয়টি তাদের কলেজের অনেক শিক্ষার্থীই জানতেন। কেউ অনলাইনে বুকিং দিলে ১ থেকে ২ সপ্তাহ সময় নিয়ে কঙ্কাল সরবরাহ করা হতো। মূলত শিক্ষার্থী ও বিক্রেতাদের কাছেই এসব কঙ্কাল বিক্রি করা হতো।
তিনি আরও জানান, কবর দেওয়ার প্রায় এক বছর পর তারা অরক্ষিত কবরগুলো পর্যবেক্ষণ করে লাশ উত্তোলন করত। যেসব কবরস্থানে সিসি ক্যামেরা, পর্যাপ্ত আলো বা নিরাপত্তা নেই, সেসব স্থানকে লক্ষ্য করেই তাদের লোকজন কঙ্কাল সংগ্রহ করত। পরে কেমিক্যাল দিয়ে সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করা হতো।
গ্রেপ্তারদের আজ আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হবে। জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে এই চক্রের সঙ্গে আরও কারা জড়িত তা বের করার চেষ্টা করা হবে বলেও জানান ডিসি ইবনে মিজান।
এদিকে কোনো পরিবার বা স্বজন যদি তাদের প্রিয়জনের কবর থেকে লাশ চুরির অভিযোগ করেন, তবে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে সেগুলো যাচাই করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান তিনি।
এনএনবাংলা/পিএইচ


আরও পড়ুন
জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযানে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২২
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডির সভাপতি হতে লাগবে না শিক্ষাগত যোগ্যতা
বাচসাস’র ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত