দেশজুড়ে জ্বালানি তেল সরবরাহে রেশনিং ব্যবস্থা চালুর পর পেট্রোল পাম্পগুলোতে অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় পাম্পে নিরাপত্তা জোরদার ও তেলের সরবরাহ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন পাম্প মালিকরা। তাদের অভিযোগ, সরকার একদিকে দেশে পর্যাপ্ত তেলের মজুত থাকার কথা বলছে, অন্যদিকে রেশনিং করে তেল সরবরাহের নির্দেশনা দিচ্ছে—যা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে পাম্প পরিচালনা বন্ধের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে পারেন বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পাম্প মালিকরা।
বুধবার (১১ মার্চ) দুপুরে রাজধানীর সিদ্বেশ্বরী সার্কুলার রোডের একটি হোটেলে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ পেট্রোলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক।
রেশনিং নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক
সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতার কারণে সরকার জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে। পাম্প মালিকরা সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী তা বাস্তবায়ন করছেন।
তবে একদিকে সরকার পর্যাপ্ত মজুতের কথা বলছে, অন্যদিকে সীমা নির্ধারণ করে তেল দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়ায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে’—এ ধরনের গুজব ছড়ানোর কারণে অনেকেই গাড়ির ট্যাংক পূর্ণ করে রাখার চেষ্টা করছেন। এতে পাম্পগুলোতে দীর্ঘ সারি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে।
পাম্পে হামলা ও কর্মীদের ঝুঁকি
সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তেল সরবরাহ কমে যাওয়ায় উত্তেজনা বাড়ছে। কোথাও কোথাও পাম্পে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। সম্প্রতি সুনামগঞ্জে এক পাম্প কর্মচারীকে ছুরিকাঘাতের ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করা হয়।
পাম্প মালিকদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় নিয়মিত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। আবার ২০২৫ সালের বিক্রির তুলনায় ১০ শতাংশ কম সরবরাহ দেওয়ার নির্দেশ থাকলেও বাস্তবে তার চেয়েও বেশি কম তেল দেওয়া হচ্ছে। অথচ এ সময়ে যানবাহনের সংখ্যা ও তেলের ব্যবহার প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে।

রাইড শেয়ার মোটরসাইকেলে তেল দেওয়ার নিয়ম নিয়ে আপত্তি
রাইড শেয়ার মোটরসাইকেলের জন্য নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে ৫ লিটার অকটেন দেওয়ার সরকারি নির্দেশনারও সমালোচনা করেন পাম্প মালিকরা। তাদের মতে, কাগজপত্র যাচাই করতে সময় লাগবে, এতে লাইনে দাঁড়ানো অন্যান্য গ্রাহকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে এবং বিশৃঙ্খলা বাড়বে।
মোবাইল কোর্ট নিয়ে ক্ষোভ
পাম্প মালিকরা অভিযোগ করেন, মনিটরিংয়ের নামে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময় পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে অভিযান চালানো হলে তাদের সামাজিকভাবে হেয় করা হচ্ছে। তাদের মতে, কোম্পানি থেকে সরবরাহ করা তেলের পরিমাণ পাম্পের ভূগর্ভস্থ ট্যাংক ও ডিসপেনসারের মিটার রিডিং যাচাই করলেই অনিয়ম আছে কি না বোঝা সম্ভব।
কৃষি ও জেনারেটর খাতে জটিলতা
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, শহরের বহুতল ভবনের জেনারেটর ও গ্রামাঞ্চলের সেচ পাম্পের জন্য আলাদা কোনো নির্দেশনা না থাকায় পাম্পগুলোতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। এতে অনেক কৃষক সেচ পাম্প চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছেন না বলেও দাবি করা হয়।
সরকারের কাছে পাম্প মালিকদের ৮ দফা দাবি
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে আট দফা দাবি জানিয়েছে পাম্প মালিকদের সংগঠন। দাবিগুলো হলো—
১. প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে পুলিশের পাশাপাশি সেনা সদস্য মোতায়েন করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
২. মোটরসাইকেলে তেল সরবরাহে কোনো ধরনের বিভাজন না রাখা।
৩. বড় ও ছোট সব পাম্পে সমানভাবে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা।
৪. বিপণন কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে তেল সরবরাহের পরিমাণ বৃদ্ধি করা।
৫. এজেন্সি, পিক পয়েন্ট ও ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে তেল সরবরাহ চালু করা।
৬. মনিটরিংয়ের নামে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে সামাজিকভাবে হেয় করা বন্ধ করা।
৭. কোনো পাম্প বা নৌযানে অবৈধ মজুত ধরা পড়লে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
৮. তেল ডিপোগুলোতে বহিরাগতদের প্রবেশ বন্ধ করা।
পাম্প মালিকদের সংগঠনের সভাপতি বলেন, দ্রুত এসব দাবি বাস্তবায়ন করে পাম্প মালিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে তারা পাম্প পরিচালনা বন্ধ রাখতে বাধ্য হতে পারেন। এতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তার দায় সরকারের ওপরই বর্তাবে।
এনএনবাংলা/


আরও পড়ুন
২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচার: সাবেক মন্ত্রী জাবেদ ও স্ত্রীর বিচার শুরু
তানজিদ ঝড়ে পাকিস্তানকে হারিয়ে ইফতার করতে গেল বাংলাদেশ
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন-ইসরায়েলি অর্থনৈতিক কেন্দ্র ও ব্যাংকে হামলার হুমকি ইরানের