বাংলাদেশের মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে আফজাল হোসেনকে চিরসবুজ নায়ক বলা হয়। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি নির্মাতা ও চিত্রশিল্পী। এছাড়া নিয়মিত লেখালেখিও করেন। প্রায় সময় তার লেখায় উঠে আসে সংস্কৃতিসহ দেশের বিভিন্ন ইস্যু। এবারের তার লেখায় উঠে এসেছে শিল্পীদের রাজনীতি করার বিষয়টি।
আজ সামাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, একটা সাক্ষাৎকারে সম্প্রতি আমাকে প্রশ্ন করা হয়, শিল্পীদের রাজনীতি করা উচিৎ কি না? এই প্রশ্ন একটা পাখি, হাতি, কুমীর, বানর বা অন্য কোন প্রাণীকে করা হবে না কারণ সবার জানা, রাজনীতি বিষয়টা মানুষদের, শুধু মানুষেরাই রাজনীতি করে। শিল্পীকে যদি মনুষ্য শ্রেণিভুক্ত ভাবা হয় তাহলে রাজনীতি করা উচিৎ নাকি উচিৎ নয়, জবাব মিলে যায়। মানুষের অনেক কিছু করার, পাওয়ার অধিকার আছে। নিজের দেশে বাস করে দেশটাকে নিজের ভাববার অধিকারই মেলে না। কেউ না কেউ মাথার উপর ছড়ি ঘুরিয়ে জানান দেয়, তুমি এইভাবে চলবে, বলবে এইভাবে আর বুঝেশুনে ভাববে।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘একজন মানুষের জীবন, ভালোলাগা, দর্শন, নীতি, দেশপ্রেম এসব কোনকিছুর তোয়াক্কা না করে কালে কালে কেউ না কেউ ঘাড়ের ওপর গরম নিশ্বাস ফেলে ভয় দেখানো গলায় বলে থাকে, আমি, আমরাই সাচ্চা দেশপ্রেমিক। সাবধান দেশের সাথে বেঈমানি করলে কল্লা নামিয়ে ফেলা হবে। কল্লা নামিয়ে ফেলা, মেরে হাত পা গুঁড়িয়ে দেয়া, পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়া, দলেবলে হামলা করে একজনের বলতে চাওয়া কথা চিরতরে না বলতে পারার অবস্থা সৃষ্টি করার নাম কি দেশপ্রেম?’
শিল্পীদের কথা উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, ‘শিল্পীর জনপরিচয় থাকে, শিল্পীদের নিয়ে মন্দ কিছু বললে সহজেই অনেক অনেক মানুষের বিশেষ মনোযোগ পাওয়া যায়। শিল্পী ভালো টোপ, শিল্পীকে যদি বদনাম করার টোপ বানানো যায় তাতে বেশি বেশি লাভের আশা থাকে। অধিকাংশ শিল্পীই কারো করুণা চায় না, বাড়তি সুবিধা নেওয়ার ধান্দা থাকে না মনে। প্রকৃত শিল্পী অনেক টাকা, উচ্চতা, অনেক সুখের কাঙাল হয় না। বোকার মতো তারা মনে করে, টাকা, স্বার্থ ইত্যাদি বিষয়গুলো শিল্প সাধনার জন্য ক্ষতিকর।’
হতাশাগ্রস্ত মানুষ মানুষের কথা উল্লেখ করে আফজাল হোসেন লিখেছেন, ‘চরিত্রবানেরা শিল্পীদের চরিত্রহীন ভাবে। ফুলের মতো পবিত্র যাদের চরিত্র তারা শিল্পীদের অসৎ, অসামাজিক, ধর্মের বিরুদ্ধের মানুষ ভাবতে আগ্রহী। আমাদের দেশটায় না জেনে, না বুঝে কথা বলা মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। অযথা যে কাউকে দোষারোপ করে, অপমান অমর্যাদা করে অনেক মানুষ নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ বানায়। সুখী হয়, মনে শান্তি পায়। কিছুই না করতে পারা, হতাশাগ্রস্ত মানুষ বেশি থাকলে সে দেশের বহু মানুষের এমনই হওয়ার কথা।’
প্রকৃত শিল্পীর জীবন নিয়ে এই অভিনেত্রী লিখেছেন, ‘একজন প্রকৃত শিল্পীর সারাটা জীবন কাটে সাধনায়। জীবনে নিষ্ঠা, সততা না থাকলে, একটা ভালো গান গাওয়া যাবে না, কালোত্তীর্ণ একটা চিত্রকলা, সাহিত্য, চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হলে অসৎ মানুষ হওয়া যাবে না, এরকম বিশ্বাস ধরে রাখতে গিয়েই শিল্পী প্রকৃতপক্ষে সভ্যতাকে রাখে স্বচ্ছ, শুদ্ধ, সুন্দর। শিল্পীজীবন মানেই নিরাপত্তাহীনতা। পদে পদে নিরাপত্তাহীন, তবু এমন অনিশ্চয়তা সত্বেও শিল্পী জীবনকে যারা বেছে নেয়, তারা নিশ্চয়ই সবার আগে বিশেষভাবে সমীহের যোগ্য। দেশের, সমাজের অনিষ্টের সাথে যুক্ত না থাকার জন্য তাদেরকে এ ঘোলা সমাজের পরিষ্কার মানুষ ভাবা যায়।’
নব্বই দশকের জনপ্রিয় এ নায়ক লেখেন, ‘যাদের মনে ভালোর আশা থাকে, শুধু ভালোর আশা নিয়ে যারা জীবন কাটিয়ে দেয়, দিতে পারে- তারা সমাজের কালো বাড়ায় না বরং ভালো বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে। এ দেশে শিল্পীর মূল্য নেই কিন্তু রাজনীতি করা তস্করেরা সম্মানিত হয়। দেশের বারোটা বাজানো মানুষদের পেছনে জয়ধ্বণি দিতে দিতে মানুষ মিছিল করে সে দেশে আশা ধরে রাখা মানুষদেরও মন ভাঙে, মনে পরিবর্তন আসে, যা অস্বাভাবিক নয়। দিনের পর দিন ধরে কোনো শিল্পী যদি অনুভব করতে থাকে—আমি ভালোবেসে, নিবেদিত হয়ে যে কাজটা করতে চাই সে কাজের প্রতি মানুষের সমীহ কম। তেমন কর্মের উপযুক্ত পরিবেশ, সুযোগ মিলছে না বা মিলছে কম, এমন মনে হলে শিল্পীর নিরাপত্তাহীনতা বেড়ে হয়ে যায় দ্বিগুণ। হরহামেশাই চোখের সামনে দেখা হয়, দেশের রাজনীতি তস্করকে মাথায় তোলা মানুষ বানাতে পারে। সে রাজনীতির ছায়া পেয়ে যদি কোন শিল্পী কিছুটা নিরাপদ অনুভব করতে চায়—তা অনেকের কাছে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে মনে হয়।’
সব শেষে তিনি লিখেছেন, ‘আমি নিজে রাজনীতির সাথে যুক্ত হইনি, হবো না। মনে করি, নিজ কর্মের মাধ্যমে দেশ, মানুষ ও সমাজের প্রতি কর্তব্য পালন করা সম্ভব কিন্তু যারা সরাসরি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হতে চায়, তারা যে সামাজিক পরিচয়েরই হোক, যে আদর্শেই নিবেদিত হতে চায়, তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী, স্বাধীন চিত্তে নিশ্চয়ই যে কেউ তা করতে পারে। সমাজের অজস্র পরিচয়ের মানুষ ফেলে শুধু শিল্পীরা কেনো রাজনীতি করবে, করা উচিৎ না উচিৎ নয় এই ভাবনা খুবই অদরকারি মনে হয়। এটা ‘মাছ না পেয়ে ছিপে কামড়’ এর মতো। যাদের আপত্তি রয়েছে, যারা দেশের ক্ষতির জন্য শিল্পীদের ঘাড়ে অনেক বড় দোষ চাপিয়ে আত্মসুখ অনুভব করেন, তাদের জন্য মানানসই একটা প্রবচন মনে পড়ছে “ভাত দেবার ক্ষমতা নেই, কিল মারার গোঁসাই।’
এনএনবাংলা/


আরও পড়ুন
দেশজুড়ে আগামীকাল শুরু হচ্ছে ‘হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি’
নিরাপত্তার চাদরে ইসলামাবাদ, ইরানের সঙ্গে বসতে পৌঁছাল মার্কিন প্রতিনিধিদল
ফুটবলারদের ‘ক্রীড়া ভাতা’ দিচ্ছে সরকার, তালিকায় নেই হামজা-শমিত