Wednesday, April 15th, 2026, 4:37 pm

যুদ্ধের ক্ষতিপূরণে ‘ন্যূনতম ২৭ হাজার কোটি ডলার’ চায় ইরান

ছবি: রয়টার্স

 

ওয়াশিংটন ও তেহরানের চলমান সংঘাত নিরসনে বিভিন্ন দেশ মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিলেও, দৃঢ় অবস্থানে থাকা ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সৃষ্ট ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে।

মঙ্গলবার জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচটি দেশ ইরানে হামলার ক্ষেত্রে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল। তাই এসব দেশকেও ক্ষতিপূরণ প্রদানে দায়িত্ব নিতে হবে।

এছাড়া, হরমুজ প্রণালিতে শুল্ক আরোপের মাধ্যমেও ক্ষতিপূরণ আদায়ের একটি সম্ভাব্য উপায় হিসেবে বিষয়টি সামনে এনেছে তেহরান—এমন তথ্য জানিয়েছে আল জাজিরা। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়েই যেত।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর ইরানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৭ হাজার কোটি ডলার বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। রুশ বার্তা সংস্থা রিয়া নভোস্তি কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন তথ্য জানিয়েছেন ইরান সরকারের মুখপাত্র ফাতেমা মোহাজেরানি। সাক্ষাৎকারটি মঙ্গলবার প্রকাশিত হয়।

ক্ষয়ক্ষতির খাতভিত্তিক বিস্তারিত এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তবে তিনি জানান, পাকিস্তানে চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠিত তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার আলোচনায় ক্ষতিপূরণের বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছিল। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে সম্ভাব্য যেকোনো বৈঠকেও এই বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।

পাঁচ সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম কারখানা, পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনা, তেল ও গ্যাস ক্ষেত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ সংবেদনশীল স্থাপনাগুলো নিয়মিত হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এসব স্থাপনা পুনর্নির্মাণে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এছাড়া, অসংখ্য সেতু, বন্দর, রেললাইন, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা কেন্দ্র, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে বহু হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অসংখ্য বেসামরিক বসতবাড়ি। তবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনও সম্পন্ন হয়নি বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার।

‘অর্থনৈতিক বাস্তবতা’

কয়েকদিন আগে ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মুখপাত্র ফাতেমা মোহাজেরানি বলেন, বর্তমান ‘অর্থনৈতিক বাস্তবতার’ কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া বাড়িঘরের মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থ সরকারের হাতে নেই।

এদিকে, ইরানি এয়ারলাইনস অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক মাকসুদ আসাদি সামানি জানিয়েছেন, হামলার ফলে তাদের ২০টি বেসামরিক উড়োজাহাজ পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে এবং আরও প্রায় ৬০টি উড়োজাহাজ ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ১৬০টি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ রয়েছে, যেগুলোর বেশিরভাগই কয়েক দশক পুরনো। এসব উড়োজাহাজ সচল রাখতে ব্যাপক রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন হলেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সামানি আরও জানান, মার্চের শেষ দিকে উদযাপিত পারসি নববর্ষ নওরোজ কে কেন্দ্র করে এয়ারলাইনগুলোর বড় আয়ের আশা ছিল। কিন্তু ৪০ দিনের যুদ্ধ সেই সম্ভাবনাও নষ্ট করে দিয়েছে। এ যুদ্ধে তাদের মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০০ ট্রিলিয়ান রিয়াল, যা প্রায় ১৯ কোটি ডলারের সমান।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় তেহরান, তাবরিজ, উরমিয়া ও খুররামাবাদসহ একাধিক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে, কন্ট্রোল টাওয়ার ও হ্যাঙ্গার ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এত বিপুল ক্ষয়ক্ষতি এবং সোমবার থেকে ইরানি বন্দরগুলোকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ শুরু হলেও, ভবিষ্যৎ আলোচনায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণসহ গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না বলে আভাস দিয়েছে ইরানি নেতৃত্ব।

দেশটির পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক কমিশনের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সময়সীমা আর বাড়ানো উচিত নয়। তার মতে, এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নতুন করে অস্ত্র মজুত ও হামলার সুযোগ পাবে।

তিনি আরও লিখেছেন, “তাদের হয় হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণসহ ইরানের সব অধিকারের স্বীকৃতি দিতে হবে, নয়তো আবার যুদ্ধে ফিরে যেতে হবে।”

থিঙ্কট্যাংক থিঙ্কট্যাংক স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআর) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরান তাদের সামরিক খাতে প্রায় ৮০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। একই বছরের অক্টোবরে ইসরায়েলের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর দেশটির কর্মকর্তারা এই ব্যয় তিনগুণ বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছিলেন।

তবে স্থানীয় পর্যায়ের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের সরকার বহু বছর ধরে বাজেট সংকটে রয়েছে—এমন তথ্যও জানিয়েছে আল জাজিরা।

এনএনবাংলা/পিএইচ